বাংলাদেশের বিনোদন জগতে সিনেমা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। একসময় সিনেমা হল ছিল মানুষের পারিবারিক এবং সামাজিক বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দু। সপরিবারে সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখা ছিল বিশেষ এক আনন্দঘন অভিজ্ঞতা। সেই সময় দর্শকদের চাপে টিকিট সংকট দেখা দিত। সিনেমা হলের সামনে ঝুলত ‘হাউজফুল’ লেখা সাইনবোর্ড। তবে সেই স্বর্ণযুগ আজ কেবলই স্মৃতি। বর্তমান সময়ে সিনেমার ব্যবসা তলানিতে ঠেকেছে। মানসম্মত সিনেমার অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক সিনেমা হল।
১৯৫৬ সালে দেশের প্রথম সবাক সিনেমা ‘মুখ ও মুখোশ’ মুক্তির পর সিনেমার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকে। দ্রুত বাড়তে থাকে সিনেমা হলের সংখ্যা। তবে শূন্য দশকের শুরুতে অশ্লীল সিনেমার প্রবণতা দর্শকদের হলবিমুখ করে। এরপর থেকেই ধস নামে সিনেমা ব্যবসায়। বর্তমানে অশ্লীলতার যুগ পেরিয়ে এলেও মানসম্মত সিনেমার অভাব এবং আধুনিক দর্শকদের চাহিদা পূরণে ব্যর্থতা এই শিল্পকে সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এক সময় দেশে ১৪৭০টি সিনেমা হল ছিল। যা কমতে কমতে এখন মাত্র ৬০টিতে এসে ঠেকেছে। বিশেষ উৎসবের সময় কিছু সিনেমা হল সাময়িকভাবে চালু হলেও এরপর সেগুলো আবার বন্ধ হয়ে যায়।
রাজধানী ঢাকায় গত কয়েক বছরে একের পর এক বন্ধ হয়েছে সিনেমা হল। সর্বশেষ ২০১৯ সালে বন্ধ হয় কাকরাইলের ঐতিহ্যবাহী ‘রাজমণি’। মানসম্মত সিনেমার অভাবে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে ‘মধুমিতা’ সিনেমা হলও। মধুমিতার কর্ণধার ইফতেখার নওশাদ জানান, লোকসানের কারণে হল চালু রাখা আর সম্ভব হচ্ছে না। সম্প্রতি একটি ভারতীয় সিনেমা ‘পুষ্পা-২’ মুক্তির পরিকল্পনা থাকলেও সেটি বাংলাদেশে প্রদর্শনের অনুমতি পায়নি। যা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।
ঢাকার বাইরে সিনেমা হলগুলোর অবস্থাও ভিন্ন নয়। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘অভিসার’ বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত পুরোনো ‘আজাদ’ সিনেমা হলও বন্ধ হওয়ার পথে। দেশের ২৯টি জেলায় এখন আর কোনো সিনেমা হল নেই। ঢাকার বিউটি, রূপমহল, গুলিস্তান, শাবিস্তান, স্টারসহ বহু সিনেমা হল ইতোমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে। সিনেমা প্রদর্শক সমিতির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মিয়া আলাউদ্দিন জানান, মানসম্পন্ন কনটেন্টের অভাবই মূলত এই ধসের জন্য দায়ী।
বিশ্লেষকদের মতে, দর্শকদের হলমুখী করতে হলে প্রয়োজন মানসম্মত এবং আধুনিক দর্শকদের চাহিদা অনুযায়ী সিনেমা নির্মাণ। কিন্তু বাজেট সংকট এবং লগ্নি তুলতে না পারার আশঙ্কায় প্রযোজকরাও ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। এর ফলে স্বল্প বাজেটের নিম্নমানের সিনেমা তৈরি হচ্ছে, যা দর্শক আকৃষ্ট করতে পারছে না।
বাংলাদেশের সিনেমা শিল্প বর্তমানে এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে এই সংকট উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সৃজনশীল চিন্তাভাবনা, মানসম্মত সিনেমা নির্মাণ এবং প্রেক্ষাগৃহগুলোর আধুনিকায়ন। পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে নীতিগত সহায়তা এবং বিনিয়োগ উৎসাহিত করার মাধ্যমে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। আজকের চলচ্চিত্র জগতের এই ক্রান্তিকালে প্রয়োজন নতুন আশার আলো।

