বিউটি পেজেন্টগুলো প্রায়শই চাকচিক্য, মর্যাদা এবং বিশ্ব শান্তির বার্তার সাথে যুক্ত হলেও- এই ইভেন্টগুলো বিতর্ক এবং নাটকীয়তা থেকে মুক্ত নয়। সম্প্রতি গাল্ফ নিউজে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিউটি পেজেন্টের ইতিহাসে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কিছু কেলেঙ্কারি ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। যেখানে লাইভ টিভিতে মারামারি, মুকুট ছিনিয়ে নেওয়া এবং এমনকি হারিয়ে যাওয়া হীরার মুকুটের ঘটনাও রয়েছে। এই প্রতিবেদনে এই বিতর্কগুলোর বিশদ বিবরণ এবং এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিতর্কসমূহ-
১. মিসেস শ্রীলঙ্কা ২০২১: মুকুট ছিনতাই: ২০২১ সালে মিসেস শ্রীলঙ্কা পেজেন্টে একটি নাটকীয় ঘটনা ঘটে যখন বিজয়ী পুষ্পিকা ডি সিলভার মাথা থেকে মুকুট জোর করে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। মিসেস ওয়ার্ল্ড ২০২০ বিজয়ী ক্যারোলিন জুরি, যিনি এই পেজেন্টে বিচারক ছিলেন, দাবি করেন যে পুষ্পিকা তালাকপ্রাপ্ত- যা পেজেন্টের নিয়মের বিরুদ্ধে। জুরি মঞ্চে উঠে পুষ্পিকার মাথা থেকে মুকুট খুলে ফেলেন এবং দ্বিতীয় রানার-আপের মাথায় পরিয়ে দেন। এই ঘটনাটি লাইভ টিভিতে সম্প্রচারিত হয়- যা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। পরে পুষ্পিকা জানান যে তিনি তালাকপ্রাপ্ত নন বরং তার স্বামীর সাথে আলাদা থাকছেন। এই ঘটনায় জুরি গ্রেপ্তার হন এবং পরে জামিনে মুক্তি পান। পুষ্পিকা তার মুকুট ফিরে পান এবং জুরির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেন।১৯৮৪ সালে ভেনেসা উইলিয়ামস যখন মিস আমেরিকা হয়েছিলেন
২. মিস আমেরিকা ১৯৮৪: ভ্যানেসা উইলিয়ামসের নগ্ন ছবি কেলেঙ্কারি: ভ্যানেসা উইলিয়ামস ১৯৮৩ সালে প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান মিস আমেরিকা হিসেবে মুকুট জিতেন। কিন্তু (১৯৮৪ সালে) তার বিজয়ের কয়েক মাস পর, পেন্টহাউস ম্যাগাজিনে তার নগ্ন ছবি প্রকাশিত হয়- যা তিনি পেজেন্টের আগে একজন ফটোগ্রাফারের সহকারী হিসেবে কাজ করার সময় তোলা হয়েছিল। এই কেলেঙ্কারির কারণে তাকে তার মুকুট ত্যাগ করতে হয়। যদিও এই ঘটনা তার পেজেন্ট ক্যারিয়ার শেষ করে দেয়, ভ্যানেসা পরবর্তীতে একজন সফল গায়িকা এবং অভিনেত্রী হিসেবে ক্যারিয়ার গড়েন। ২০১৫ সালে মিস আমেরিকা সংস্থা তাকে সরকারিভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং তাকে বিচারক হিসেবে আমন্ত্রণ জানায়।
৩. মিস ইউনিভার্স ২০১৫: ভুল বিজয়ী ঘোষণা: ২০১৫ সালের মিস ইউনিভার্স পেজেন্টে একটি অবিস্মরণীয় ভুল ঘটে যখন উপস্থাপক স্টিভ হার্ভে ভুলভাবে কলম্বিয়ার আরিয়াডনা গুতিয়েরেজকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। কয়েক মিনিট পর তিনি মঞ্চে ফিরে এসে ঘোষণা করেন যে প্রকৃত বিজয়ী ছিলেন ফিলিপাইনের পিয়া উয়ার্টজবাখ। এই ভুলের কারণে মুকুটটি গুতিয়েরেজের মাথা থেকে খুলে উয়ার্টজবাখের মাথায় পরানো হয়, যা লাইভ টিভিতে সম্প্রচারিত হয়। এই ঘটনা বিশ্বব্যাপী আলোচনার জন্ম দেয় এবং হার্ভে পরে সরকারিভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কেউ কেউ এই ঘটনাকে পেজেন্টের প্রচারণার জন্য একটি কৌশল হিসেবে বিবেচনা করেন।
৪. মিস ইউনিভার্স ২০০২: অক্সানা ফেদোরোভার মুকুট হারানো: রাশিয়ার অক্সানা ফেদোরোভা ২০০২ সালে মিস ইউনিভার্স মুকুট জিতেন কিন্তু মাত্র কয়েক মাস পর তাকে তার মুকুট ত্যাগ করতে হয়। পেজেন্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, তিনি তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, কারণ তিনি তার আইনের ডিগ্রি সম্পন্ন করতে বেশি মনোযোগ দিয়েছিলেন। এই ঘটনা বিউটি পেজেন্টের কঠোর চুক্তি এবং প্রত্যাশার উপর আলোকপাত করে।
৫. মিস ব্রাজিল ২০১৫: মঞ্চে মারামারি: ২০১৫ সালে মিস ব্রাজিল পেজেন্টে একটি নাটকীয় ঘটনা ঘটে যখন রানার-আপ শেসলাইন হায়ালা বিজয়ী মেলিসা টলেডোর মাথা থেকে মুকুট ছিনিয়ে নেন। হায়ালা দাবি করেন যে টলেডো অর্থ দিয়ে বিজয় কিনেছেন। এই ঘটনা মঞ্চে উত্তেজনা সৃষ্টি করে এবং পেজেন্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত টলেডোর মুকুট পুনরুদ্ধার করে। হায়ালা পরে বলেন, তিনি আমাজনের মানুষকে দেখাতে চেয়েছিলেন যে অর্থ সবকিছু নয়।
৬. মিস গ্র্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ২০২৪: রাচেল গুপ্তার অভিযোগ: ভারতের প্রথম মিস গ্র্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল বিজয়ী রাচেল গুপ্তা ২০২৪ সালে তার মুকুট ত্যাগ করেন এবং একটি ৫৬ মিনিটের ইউটিউব ভিডিওতে পেজেন্ট সংস্থার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলেন। তিনি দাবি করেন যে তিনি অবহেলা, দুর্ব্যবহার এবং সমর্থনের অভাবের শিকার হয়েছেন। গুপ্তা বলেন, চুক্তি স্বাক্ষরের সময় তাকে আইনজীবীর পরামর্শ নিতে দেওয়া হয়নি এবং মুকুট হারানোর ভয় দেখিয়ে তাকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। পেজেন্ট কর্তৃপক্ষ দাবি করে যে তিনি গুয়াতেমালায় তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। এই ঘটনা পেজেন্ট জগতে ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন তুলেছে।
৭. মিস ইউএসএ ২০২২: রিগিং অভিযোগ: ২০২২ সালে মিস ইউএসএ পেজেন্টে মিস টেক্সাস আর’বনি গ্যাব্রিয়েলের বিজয় নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। অনেক প্রতিযোগী দাবি করেন যে পেজেন্টটি পূর্বনির্ধারিত ছিল। অভিযোগ উঠে যে গ্যাব্রিয়েল পেজেন্টের আগে একটি প্লাস্টিক সার্জারি ক্লিনিকের জন্য বিজ্ঞাপন চিত্রায়িত করেছিলেন- যা পুরস্কারের অংশ ছিল। এই অভিযোগের পর মিস ইউএসএ সভাপতি ক্রিস্টাল স্টুয়ার্টকে সাময়িকভাবে সাসপেন্ড করা হয়, যদিও তদন্তে রিগিং অভিযোগ মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়।
পেজেন্ট জগতের সমস্যা এবং সমালোচনা-
এই বিতর্কগুলো বিউটি পেজেন্টের কঠোর নিয়ম, চুক্তির জটিলতা এবং প্রতিযোগীদের উপর অযৌক্তিক প্রত্যাশার উপর আলোকপাত করে। মিস ইংল্যান্ড ২০২৫ মিলা ম্যাগির সাম্প্রতিক অভিযোগ, যিনি মিস ওয়ার্ল্ড পেজেন্টকে “শোষণমূলক এবং বিষাক্ত” বলে অভিহিত করেন, পেজেন্টের কাজের পরিবেশ এবং স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। প্রতিযোগীদের পাতলা কোমর, নিখুঁত চেহারা এবং নির্দিষ্ট আচরণের মানদণ্ড মেনে চলতে হয়- যা অনেক সময় অবাস্তব এবং নিপীড়নমূলক বলে সমালোচিত হয়। পেজেন্টে কোনো কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার অভাবও এই সমস্যাগুলোকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিউটি পেজেন্টগুলো যদিও নারীদের প্রতিভা এবং সৌন্দর্য প্রদর্শনের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে এই ঘটনাগুলো দেখায় যে এই জগৎ নাটক, কেলেঙ্কারি এবং বিতর্কে ভরা। মুকুট হারানো থেকে শুরু করে মঞ্চে মারামারি, এই ঘটনাগুলো পেজেন্টের গ্ল্যামারের পিছনের কঠোর বাস্তবতা প্রকাশ করে। এই বিতর্কগুলো পেজেন্ট সংস্থাগুলোকে আরও স্বচ্ছ, ন্যায্য এবং প্রতিযোগীবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। ভবিষ্যতে- পেজেন্ট জগতের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখতে হলে এই সমস্যাগুলোর সমাধান এবং আধুনিক মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিয়ম প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি।

