এক সময়ের টিভি নাটক মানেই ছিল ঘরোয়া আবেগ, প্রেম-ভালোবাসা, সম্পর্কের টানাপোড়েন আর পারিবারিক কাহিনি। দর্শকেরা টিভি চালিয়ে অপেক্ষা করত প্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীর সংলাপ শোনার জন্য। কিন্তু সময় বদলেছে, বদলেছে রুচি ও বিনোদনের মাধ্যম। এখন দর্শক আর শুধু ‘নাটক’ খোঁজেন না—তারা খোঁজেন ‘কোন গল্পটা দেখতে ইচ্ছা করছে?’
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই আজকের পাঠক বা দর্শক টেলিভিশন স্ক্রিন থেকে সরে গিয়ে মোবাইল বা ল্যাপটপে থামছে—ওটিটি প্ল্যাটফর্মে।
বর্তমান সময়ের টিভি নাটকে দেখা যায় বারবার ঘুরেফিরে একই রকম গল্প—কখনো সম্পর্কের মান-অভিমান, কখনো হাসির মোড়কে ‘কাতুকুতু কমেডি’। ধারাবাহিক নাটকের সংখ্যাও প্রচুর, কিন্তু বেশিরভাগই ৫০ পর্ব পার করে একরকম বোরিং লুপে ঢুকে পড়ে। অভিনয়ে প্রাণ নেই, গল্পে বৈচিত্র্য নেই, নির্মাণেও নেই নতুনত্ব।
এই পরিস্থিতিতে এক শ্রেণির দর্শক এখন টিভি নাটক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। তারা চাইছেন এমন কিছু—যেখানে গল্পে থাকবে বাস্তবতা, চরিত্র হবে গভীর, নির্মাণে থাকবে কারিগরি উৎকর্ষ এবং থিমে থাকবে সাহস।
ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ঠিক এই সুযোগটাই এনে দিয়েছে। দেশি-বিদেশি অ্যাপ ভিত্তিক এই প্ল্যাটফর্মগুলো ও ইউটিউব চ্যানেলগুলোতে এখন একের পর এক সিরিজ ও কনটেন্ট আসছে, যা ফর্ম্যাটে, গল্পে এবং দৃষ্টিভঙ্গিতে আলাদা।
একটি ওয়েব সিরিজ সাধারণত ২০-৪০ মিনিট দৈর্ঘ্যের একাধিক পর্বে বিভক্ত হয়। প্রতিটি পর্বে থাকে থ্রিলার, সামাজিক বাস্তবতা, অপরাধ, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, ডার্ক হিউমার বা সাহসী রাজনৈতিক বার্তা। চরিত্রগুলো জটিল, সাব-প্লট থাকে একাধিক, আর নির্মাণে থাকে একধরনের স্বাধীনতা—যা টিভি নাটকে কল্পনাও করা যায় না।
এর বড় একটি কারণ—ওটিটি কনটেন্ট বিনামূল্যে নয়, সাবস্ক্রিপশন ভিত্তিক। অর্থাৎ দর্শক যখন টাকা দিয়ে কিছু দেখছেন, তখন নির্মাতারাও বাধ্য হচ্ছেন মানের দিকে খেয়াল রাখতে।
ওটিটি নির্মাতাদের জন্য একটি মুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এখানে নেই বিজ্ঞাপনের কাঁচি, নেই চ্যানেলের ‘কমিটি’র সিদ্ধান্ত, নেই স্পন্সরের মুখ চেয়ে গল্প পাল্টে ফেলার বাধ্যবাধকতা। ফলে চিত্রনাট্যকার থেকে পরিচালক—সবাই এখন গল্প বলার স্বাধীনতায় নতুন ভাষা তৈরি করছেন।
এখানে নতুন মুখদেরও জায়গা হচ্ছে। যারা টিভিতে সুযোগ পেতেন না, তারাই এখন ওয়েব দুনিয়ায় জনপ্রিয়। চিত্রনাট্যকারদের জন্য এটি এক স্বপ্নের প্ল্যাটফর্ম—নির্ধারিত সময়সীমা না থাকায় গল্পের গভীরে যাওয়ার সুযোগ থাকে।
অন্যদিকে, টিভি নাটক যেন আটকে পড়েছে একটি স্থবিরতার চক্রে। নাট্যনির্মাতারা নিজেরাই বলছেন, “সময় নেই, বাজেট নেই, গল্পে স্বাধীনতা নেই। নাটক বানাতে হয় শুধু দায় মেটাতে।” প্রতিটি নাটক নির্মাণে চিন্তা করতে হয়—বিজ্ঞাপনদাতা কী বলবে, সময় কতটুকু, চ্যানেল কাঁচি চালাবে কিনা।
এমনকি অনেক সময় নাটকের গল্প সম্পূর্ণ পাল্টে যায় প্রিভিউ কমিটির কারণে। যেখানে শিল্পের জায়গা হারিয়ে যায়, সেখানে গল্প আর কতটুকু বাঁচে?
যদিও শহর ও তরুণ প্রজন্ম ওয়েব সিরিজের প্রতি ঝুঁকেছে, তবুও টিভি নাটক এখনো শহরের বাইরের ও মধ্যবয়সি দর্শকদের কাছে জনপ্রিয়। বিশেষ করে ঈদ ও জাতীয় দিবসের নাটকগুলো এখনো টিভির পর্দায় একটি আলাদা গুরুত্ব বহন করে।
তবে স্পষ্টতই বলা যায়, ঢাকার নাগরিক দর্শক বা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণরা এখন নাটক নয়, ওয়েব সিরিজের নতুন পর্ব নিয়ে অপেক্ষায় থাকে।
তবে ওটিটিকে ঘিরে বিতর্কও কম নয়। কিছু নির্মাতা ‘স্বাধীনতা’র নামে কনটেন্টে অশ্লীলতা, অপ্রয়োজনীয় যৌন ইঙ্গিত এবং অতিরঞ্জিত সংলাপ সংযোজন করছেন, যা দর্শকের একটি অংশকে বিরক্ত করছে। উঠছে সেন্সর নীতিমালার দাবি।
বিশ্লেষকদের মত, “সাহসী গল্প বলার স্বাধীনতা থাকা ভালো, কিন্তু তা যেন সামাজিক শালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে। না হলে এ মাধ্যমও একদিন দর্শক হারাবে।”
আফজাল হোসেন বলেন, “স্বাধীনতা থাকলেই সেটা শিল্প হয় না। ওয়েবে ভালো কাজ হচ্ছে ঠিক, কিন্তু সামাজিক দায়বদ্ধতা মাথায় রাখতে হবে।”
জাহিদ হাসান মনে করেন, “টিভি নাটক সব শ্রেণির মানুষের জন্য। ওয়েব সিরিজ শহুরে দর্শকের জন্য চমৎকার হলেও, বাংলাদেশের বিশাল দর্শকবর্গ এখনও টেলিভিশনের উপর নির্ভরশীল।”
মোশাররফ করিম বলেন, “ওটিটিতে চরিত্র নিয়ে খেলার সুযোগ বেশি, সময় বেশি। তবে কিছু নির্মাতা সেই সুযোগের অপব্যবহার করছেন।”
জাকিয়া বারী মম বলেন, “ওয়েবে কাজের পরিসর অনেক বড়। গল্পে চরিত্রে ডুব দেওয়া যায়। তবে ভালো গল্প ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়—মাধ্যম যাই হোক।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ওয়েব সিরিজ ও টিভি নাটক একে অপরের প্রতিযোগী নয়, বরং পরিপূরক। টিভি নাটক এখনো পারিবারিক ও জাতীয় প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ওয়েব সিরিজ যুগোপযোগী গল্প বলার নতুন মাধ্যম হয়ে উঠছে।
সত্যি বলতে, বাংলাদেশের নাটকশিল্পে এ পরিবর্তন সময়েরই দাবি ছিল। টিভি নাটকের গৌরবময় অতীতকে অস্বীকার না করেই বলতে হয়—ওটিটি আমাদের নতুন এক নাট্যভাষা দিয়েছে। একটি এমন প্ল্যাটফর্ম, যেখানে গল্প বলার স্বাধীনতা আবারো শিল্প হয়ে উঠছে।

