ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহুল আলোচিত তৃতীয় টার্মিনাল কবে চালু হবে, তা নিয়ে এখন যেন ধোঁয়াশার শেষ নেই। এক সময় বলা হয়েছিল, ২০২৫ সালের জুন-জুলাইয়ের মধ্যেই এটি চালু হবে। তারপর সেই সময় পিছিয়ে ডিসেম্বর বলা হলো। এখন আবার সেই ডিসেম্বরও অনিশ্চিত।
প্রকল্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা বলছেন, ডিসেম্বর তো দূরের কথা—এমনকি ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেও টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে কিনা, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, টার্মিনালের মূল ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হলেও এখনও চলছে নানা প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি স্থাপন, ক্যালিব্রেশন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ। পূর্ব পাশের অবকাঠামো এখনো নির্মাণাধীন। তার ওপর টার্মিনাল পরিচালনার জন্য জাপানি সংস্থা জাইকা-র সঙ্গে চুক্তি এখনও সম্পন্ন হয়নি, যা একেবারে জরুরি একটি ধাপ।
এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৬ হাজার দক্ষ জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যার মধ্যে ৪ হাজার জন শুধু নিরাপত্তা বাহিনীতে থাকবে। এত বিশাল স্কেলের জনশক্তি একদিকে নিয়োগ, অন্যদিকে প্রশিক্ষণ—সবকিছু মিলিয়ে সময়সাপেক্ষ।
প্রথমদিকে প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা সাবেক চেয়ারম্যান মঞ্জুর কবীর ভুঁইয়া জোর দিয়েই বলেছিলেন, ২০২৪ সালের মধ্যেই টার্মিনাল চালু হবে। কিন্তু দায়িত্ব বদলের সঙ্গে সঙ্গেই সেই ঘোষণা নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) বদলের কারণে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় যে স্থবিরতা তৈরি হয়, সেটিই এখন বাস্তব চিত্রে ফুটে উঠছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ভাষায়, তৃতীয় টার্মিনাল চালু নিয়ে বর্তমানে “এক ধরনের লেজেগোবরে” অবস্থা বিরাজ করছে। কেউ স্পষ্ট করে বলতে পারছে না কবে নাগাদ এটি পুরোদমে যাত্রীসেবা দিতে পারবে।
এই প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের অংশ ৫ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। বাস্তবায়ন করছে এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম, যেখানে রয়েছে জাপানের মিতসুবিশি করপোরেশন, ফুজিতা করপোরেশন ও কোরিয়ার স্যামসাং সিঅ্যান্ডটি।
২০২০ সালের ৬ এপ্রিল কাজ শুরু হয় এবং ৪৮ মাসের মেয়াদে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে যেটা ছিল শুধুই এক ‘সফট লঞ্চিং’, সেটাই এখন পর্যন্ত একমাত্র দৃশ্যমান উদ্যাপন।
তৃতীয় টার্মিনালটি যদি একবার পূর্ণদমে চালু হয়, তাহলে এটি হবে দেশের সবচেয়ে আধুনিক এবং সর্ববৃহৎ বিমান টার্মিনাল।
-
আয়তন: ২ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার
-
যাত্রী ধারণক্ষমতা: বছরে ১.৬ কোটি
-
পার্কিং স্পেস: ১,২৩০টি গাড়ির
-
উড়োজাহাজ পার্কিং বে: ৩৭টি
-
চেক-ইন কাউন্টার: ১১৫টি (স্বয়ংক্রিয় ১৫টি)
-
ইমিগ্রেশন কাউন্টার: ১২৮টি, যার মধ্যে স্বয়ংক্রিয় ১৫টি
-
কাস্টমস হল: ১টি (আয়তন ১,৩০০ বর্গমিটার)
-
বোর্ডিং ব্রিজ: ১২টি (পরবর্তীতে আরও ১৪টি যুক্ত হবে)
এছাড়া যাত্রীদের জন্য থাকছে প্লে-জোন, মুভি লাউঞ্জ, ডে-রুম, ফুডকোর্ট, ট্রানজিট লাউঞ্জ, ভিআইপি এরিয়া এবং পাতাল রেল সংযোগ।
বাস্তবতা হলো, এসব সুবিধার বেশিরভাগই এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। চুক্তি, জনবল, নিরাপত্তা এবং অপারেশনাল সমন্বয়—সব মিলিয়ে এখনও বহু ধাপ বাকি।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক জানান,
“আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তৃতীয় টার্মিনাল চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছি। এখানে অনেক স্টেকহোল্ডার রয়েছে। তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে, সময়মতোই আমরা সিদ্ধান্ত নেব।”
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রায় ৯৮% নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এখন বাকি কেবল অপারেশনাল প্রস্তুতি, যা ২০২৫ সালের মধ্যেই সম্পন্ন করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালটি বাংলাদেশের বিমান খাতের জন্য এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে—যদি এটি সময়মতো, সুষ্ঠুভাবে চালু হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সিদ্ধান্তহীনতা, সমন্বয়ের অভাব আর প্রশাসনিক জটিলতা এ প্রকল্পকে দিন দিন আরও পেছনে ঠেলে দিচ্ছে।
কেবল উদ্বোধনের ‘তারিখ’ ঘোষণা করে আর দৃষ্টিনন্দন ভবনের ছবি দিয়ে আস্থা ফিরিয়ে আনা যাবে না—এখন দরকার কার্যকর পদক্ষেপ, কঠিন সিদ্ধান্ত এবং সর্বোপরি একটি নির্ভরযোগ্য টাইমলাইন।

