মিসরের গিজায় অবস্থিত পিরামিডগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত ও বিস্ময়কর প্রাচীন স্থাপনার অন্যতম। নির্মাণের চার হাজার বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, তবু এই বিশাল পাথরের স্থাপনাগুলো আজও ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদদের বিস্মিত করে চলেছে। গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস যখন প্রায় ২,৪০০ বছর আগে পিরামিডের মহিমা নিয়ে লিখেছিলেন, তখনও এগুলো ছিল বহু শতাব্দী পুরোনো।
আজকের দিনে এসে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেও গিজার পিরামিড নিয়ে নতুন নতুন প্রশ্নের জন্ম হচ্ছে। ভেতরে লুকিয়ে থাকা অজানা ফাঁকা জায়গা, সম্ভাব্য গোপন প্রবেশপথ—এসব ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এই প্রাচীন সমাধিগুলো এখনো তাদের সব কথা বলেনি।
মেনকাউরের পিরামিড: ছোট হলেও রহস্যে ভরা
গিজার তিনটি প্রধান পিরামিডের মধ্যে সবচেয়ে ছোটটি হলো মেনকাউরের পিরামিড। ধারণা করা হয়, এটি খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ২৫০০ সালে চতুর্থ রাজবংশের ফেরাউন মেনকাউরের সমাধি হিসেবে নির্মিত হয়। বিশাল আকারের চুনাপাথর ও গ্রানাইট ব্লক দিয়ে তৈরি এই পিরামিডটি নির্মাণের সময় প্রায় ২১৫ ফুট উঁচু ছিল। তবে শত শত বছরের ক্ষয়, প্রাকৃতিক ক্ষতি এবং অন্য নির্মাণকাজে পাথর খুলে নেওয়ার কারণে এখন এর উচ্চতা প্রায় ২০০ ফুটে নেমে এসেছে।
উনিশ শতকে প্রত্নতত্ত্ববিদরা যখন প্রথম গিজার পিরামিডগুলোর ভেতরে প্রবেশ করেন, তখন তারা দেখতে পান—ভেতরের কাঠামো অনেক আগেই লুট হয়ে গেছে। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়, আদতে এগুলোর ভেতরে কী ছিল এবং কীভাবে সেগুলো ব্যবহার করা হতো। মেনকাউরের পিরামিডের মূল প্রবেশপথটি ১৮৩৭ সালে উত্তর দিকের দেয়ালে লুকানো অবস্থায় আবিষ্কৃত হয়। ধারণা করা হয়, নিচের অংশে ব্যবহৃত শক্ত গ্রানাইটের আবরণই শত শত বছর ধরে লুটেরাদের প্রবেশ ঠেকিয়ে রেখেছিল।
পিরামিডের ভেতরে পাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলোর একটি ছিল অলংকৃত একটি সারকোফাগাস। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেটি ইউরোপে পাঠানোর সময় ভূমধ্যসাগরে ডুবে যায় এবং আর কখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে মিসরের আইন অনুযায়ী গিজার পিরামিডে কোনো ধরনের ধ্বংসাত্মক খনন নিষিদ্ধ। ফলে বিজ্ঞানীরা এখন সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছেন আধুনিক, অক্ষত রাখার মতো প্রযুক্তির ওপর। ২০২৫ সালে জার্মান ও মিসরীয় প্রত্নতত্ত্ববিদদের একটি দল রাডার, বৈদ্যুতিক রেজিস্টিভিটি ও আল্ট্রাসাউন্ড প্রযুক্তি ব্যবহার করে মেনকাউরের পিরামিডের নিচে একটি রহস্যময় বায়ুভর্তি ‘ফাঁকা জায়গা’ শনাক্ত করেন।
রিমোট-কন্ট্রোল ক্যামেরায় তোলা ছবিতে দেখা যায়, পিরামিডের পূর্ব পাশে এই ফাঁকা অংশটি সম্ভবত একটি গোপন ‘দ্বিতীয় প্রবেশপথ’ হতে পারে। তবে সেখানে মানুষের চলাচলের কোনো চিহ্ন, এমনকি পায়ের ছাপও নেই। তাই এই কক্ষের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, সে বিষয়ে গবেষকেরা এখনো নিশ্চিত নন।
এ ছাড়া পিরামিডের ঠিক পূর্বে অবস্থিত একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া মন্দিরেও আরেকটি ফাঁকা জায়গা শনাক্ত হয়েছে। মিসরবিদ জাহি হাওয়াসের ধারণা, এখানে প্রাচীন মিসরীয় দেবতাদের মূর্তি কিংবা স্বয়ং ফেরাউন মেনকাউরের প্রতিকৃতি লুকিয়ে রাখা থাকতে পারে। তাঁর ভাষায়, সে সময় মন্দিরের ভেতরে মূর্তি লুকিয়ে রাখার প্রচলন ছিল।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মিসরবিদ পিটার ডার ম্যানুয়েলিয়ান, যিনি ডিজিটাল গিজা প্রকল্প পরিচালনা করছেন, বলেন—মেনকাউরের পিরামিডে পাওয়া এই ফাঁকা জায়গাগুলো নিঃসন্দেহে অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য বড় সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
খুফুর গ্রেট পিরামিড: আরও বড় রহস্য
মেনকাউরের পিরামিডে এই আবিষ্কারগুলো হওয়ার কয়েক বছর আগেই একই গবেষক দলের সদস্যরা গিজার সবচেয়ে বড় পিরামিড—খুফুর গ্রেট পিরামিডের ভেতরে একটি বায়ুভর্তি ফাঁকা জায়গার অস্তিত্ব নিশ্চিত করেন। চতুর্থ রাজবংশের ফেরাউন খুফুর জন্য নির্মিত এই পিরামিডটি খ্রিষ্টপূর্ব ২৫৮০ থেকে ২৫৫০ সালের মধ্যে তৈরি হয়। নির্মাণের সময় এর উচ্চতা ছিল প্রায় ৪৮১ ফুট, যা বর্তমানে কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫৫ ফুটে।
এই ফাঁকা জায়গার ইঙ্গিত প্রথম পাওয়া যায় প্রায় এক দশক আগে, যখন জাপানি গবেষকেরা কসমিক রে বা মহাজাগতিক কণার শক্তি পরিমাপ করে পিরামিডের ভেতরের কাঠামো বিশ্লেষণ করেন। ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, এই ফাঁকা জায়গাটিও সম্ভবত একটি লুকানো প্রবেশপথের সঙ্গে যুক্ত।
এর আগেই, ২০১৭ সালের এক গবেষণায় গ্রেট পিরামিডের কেন্দ্রে, গ্র্যান্ড গ্যালারির ঢালু পথের ওপরে আরও বড় একটি ফাঁকা জায়গার অস্তিত্ব নথিভুক্ত করা হয়েছিল।
তবে জাহি হাওয়াসের মতে, এসব ফাঁকা জায়গা সব সময় গোপন কক্ষ বা ধনসম্পদের ইঙ্গিত দেয় না। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো পিরামিড নির্মাণের সময় তৈরি হওয়া অভ্যন্তরীণ পথ, চাপ কমানোর গহ্বর কিংবা বিশাল পাথরের ওজন ভারসাম্য রাখতে ব্যবহৃত কাঠামোর অংশও হতে পারে।
তিনি জানান, স্ক্যানপিরামিডস প্রকল্পের অধীনে পরবর্তী ধাপে গিজার তিন প্রধান পিরামিডের মাঝারি আকারেরটি—খাফরের পিরামিড—নিয়ে গবেষণা করা হবে। খুফুর পুত্র খাফরের জন্য নির্মিত এই পিরামিডটি খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ২৫৭০ সালে তৈরি হয় এবং নির্মাণকালে এর উচ্চতা ছিল ৪৭০ ফুটেরও বেশি। বর্তমানে এটি দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৪৪৮ ফুট উচ্চতায়।
গিজার পিরামিড কীভাবে নির্মিত হয়েছিল?
কায়রোর পশ্চিমে অবস্থিত গিজা মালভূমিতে মোটামুটি দশটি পিরামিড রয়েছে, যদিও সবচেয়ে বড় তিনটির ছায়ায় বাকিগুলো অনেকটাই আড়ালে পড়ে গেছে। পুরো মিসরজুড়ে প্রাচীন পিরামিডের সংখ্যা ১২০টিরও বেশি। তবে বিশাল আকার ও নিখুঁত নির্মাণশৈলীর কারণেই গিজার পিরামিডগুলো প্রাচীনকাল থেকেই বিশ্বজুড়ে খ্যাত।
জাহি হাওয়াসের ব্যাখ্যায়, এই পিরামিডগুলোর বিশালতার পেছনে বড় কারণ ছিল গিজা অঞ্চলে পাওয়া অসাধারণ মানের চুনাপাথর, যা মিসরের অন্য কোথাও এত ভালোভাবে পাওয়া যায় না। প্রতিটি প্রধান পিরামিডের জন্য আলাদা আলাদা তিনটি চুনাপাথরের খনি শনাক্ত করা হয়েছে, যেগুলো ছিল নির্মাণস্থলের কাছেই।
তবু শত শত বছরের গবেষণার পরও একটি বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই বিশাল ৬০ টন ওজনের পাথরগুলো কীভাবে সরানো হয়েছিল, আর কারাই বা এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়ন করেছিল? হাওয়াস দৃঢ়ভাবে মনে করেন, গিজার পিরামিড কোনো অজানা প্রাচীন সভ্যতার কাজ নয়।
তার মতে, এই স্থাপনাগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এগুলো নির্মাণ করেছিলেন স্বয়ং প্রাচীন মিসরীয়রাই। তাঁর ভাষায়, মানুষকে বুঝতে হবে কীভাবে প্রাচীন মিসরীয়রা এই বিশাল পাথরগুলো সরিয়েছিল। এটি ছিল একটি জাতীয় প্রকল্প, যেখানে পুরো সমাজ অংশ নিয়েছিল তাদের রাজাকে দেবতায় পরিণত করার জন্য।
আজকের দিনে আধুনিক, অক্ষত-রক্ষা প্রযুক্তির মাধ্যমে গবেষকেরা পিরামিডের গভীরে আরও বেশি উঁকি দিতে পারছেন। সেই সঙ্গে পুরোনো প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার পাশাপাশি জন্ম নিচ্ছে নতুন নতুন রহস্য। গিজার পিরামিড তাই শুধু অতীতের স্মারক নয়—এটি এখনো চলমান এক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দু।

