সংস্কৃতি বললেই অনেকে প্রথমে ভাবেন নাটক, কবিতা, গান বা সিনেমার কথা—যা মঞ্চে বা পর্দায় দেখা যায়। দীর্ঘদিন ধরে এই ধারণাটিই ছিল মূলধারা। কিন্তু ব্রিটিশ চিন্তাবিদ রেমন্ড উইলিয়ামস খুব শান্ত অথচ গভীরভাবে সেই প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করান।
তিনি বলেন, সংস্কৃতি কেবল শিল্পকলা নয়। সংস্কৃতি হলো জীবনযাপন। মানুষ কীভাবে কথা বলে, পরিবার চালায়, কাজ করে, উৎসব পালন করে, এমনকি কীভাবে স্বপ্ন দেখে—এসবের সবই সংস্কৃতির অংশ।
১৯২১ সালের ৩১ আগস্ট যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া এবং ১৯৮৮ সালের ২৬ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করা উইলিয়ামস সাংস্কৃতিক তত্ত্বের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্বীকৃত। পেশায় তিনি সাহিত্য শিক্ষক ছিলেন, কিন্তু তাঁর দৃষ্টি ছিল সমাজের গভীরে। তিনি বোঝার চেষ্টা করেছেন ক্ষমতা এবং অর্থনীতি শুধু কারখানা বা বাজারে কাজ করে না, এগুলো কাজ করে ভাষায়, টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে, স্কুলের পাঠ্যবইয়ে, পরিবারে এবং এমন সব অভ্যাসের ভেতরে যেগুলোকে আমরা প্রায়ই “স্বাভাবিক” বলে ধরে নিই।
এই প্রেক্ষাপটেই তাঁর বিখ্যাত ধারণা—“culture is ordinary”। অর্থাৎ সংস্কৃতি কোনো বিশেষ শ্রেণির বিলাসদ্রব্য নয়। এটি সাধারণ মানুষের সাধারণ জীবনের মধ্যেই গড়ে ওঠে। একজন কৃষক তার জমি নিয়ে যা ভাবে, একজন শ্রমিক তার মজুরি নিয়ে যে হিসাব করে, একজন মা তার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে স্বপ্ন ও উদ্বেগ লালন করেন—এসবই সংস্কৃতির অংশ। কারণ এই ভাবনাগুলোর ভেতরে থাকে মূল্যবোধ, আকাঙ্ক্ষা, ভয় এবং সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রক্রিয়া।
উইলিয়ামসের মতে, একটি সমাজে কেবল তথাকথিত “উঁচু শিল্প” নয়, দৈনন্দিন যোগাযোগও ক্ষমতার ক্ষেত্র। কে কার ভাষাকে “শুদ্ধ” বলে চিহ্নিত করছে, কে কার উচ্চারণকে “গ্রাম্য” বলে ছোট করছে, কোন পোশাককে “ভদ্র” বলা হচ্ছে—এসবের মধ্যেও শ্রেণিগত অবস্থান কাজ করে। সংস্কৃতির এই লুকানো রাজনীতিকে তিনি সামনে আনেন এবং দেখান, ক্ষমতা কেবল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয় বরং সংস্কৃতির ভেতরেও সক্রিয়।
তিনি আরও বিশ্লেষণ করেন যে সমাজে এক ধরনের dominant বা প্রভাবশালী সংস্কৃতি থাকে, যা নিজেকে স্বাভাবিক এবং গ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু এর পাশাপাশি residual অর্থাৎ অতীত থেকে টিকে থাকা সংস্কৃতি এবং emergent অর্থাৎ নতুনভাবে জন্ম নেওয়া সংস্কৃতিও থাকে। এর অর্থ, সংস্কৃতি স্থির নয়। এটি সংঘর্ষ, টানাপোড়েন এবং পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে ক্রমাগত রূপান্তরিত হয়। আজ যে গানকে “নষ্ট সংস্কৃতি” বলা হচ্ছে, কাল সেটিই হয়তো মূলধারায় জায়গা করে নিতে পারে। আজ যে ভাষাকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেটিই সম্মানজনক মর্যাদা পেতে পারে। সংস্কৃতি তাই কেবল ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা নয়, এটি চলমান লড়াইয়ের ক্ষেত্র।
উইলিয়ামসের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে– Culture and Society, The Long Revolution, Keywords এবং Marxism and Literature। বিশেষ করে Keywords গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, উন্নয়ন, পরিবার বা সংস্কৃতি—এ ধরনের শব্দের অর্থ কীভাবে ইতিহাসের প্রবাহে বদলে যায়। আমরা যেমন শব্দ ব্যবহার করি, তেমনি শব্দও আমাদের ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে—এই সতর্ক বার্তাটি তিনি বারবার উচ্চারণ করেছেন।
উইলিয়ামসের এই চিন্তাধারা বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এখানে “সংস্কৃতি” শব্দটি প্রায়ই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে। কেউ বলেন, এটি আমাদের সংস্কৃতি নয়। কেউ বলেন, এটি পশ্চিমা প্রভাব। আবার কেউ এটিকে আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে দেখেন। কিন্তু উইলিয়ামসের দৃষ্টিতে সংস্কৃতি কোনো সিলমোহর দেওয়া স্থির বস্তু নয়। সংস্কৃতি হলো মানুষ কীভাবে বাঁচছে এবং কীভাবে বাঁচতে চায়—তার সমষ্টিগত অভিজ্ঞতা ও কাহিনি। যখন সংস্কৃতিকে কোনো নির্দিষ্ট দল বা শ্রেণির একচ্ছত্র সম্পত্তি বানানো হয়, তখন সেটি জীবন্ত থাকে না বরং শাসনের ভাষায় পরিণত হয়।
সবশেষে তিনি একটি মৌলিক প্রশ্নের দিকে আমাদের ফিরিয়ে দেন। আমরা যে জীবনযাপন করছি—আমাদের ভাষা, সন্তানকে শেখানোর পদ্ধতি, আমাদের ভয় ও ভালোবাসা, আমাদের রুচি—এসব কি সম্পূর্ণ আমাদের নিজস্ব নির্বাচন, নাকি সমাজ অদৃশ্যভাবে আমাদের হয়ে সেগুলো নির্ধারণ করে দিচ্ছে?
রেমন্ড উইলিয়ামস আমাদের একটি গভীর উপলব্ধি দেন। সংস্কৃতি শুধু দেখার বিষয় নয়, সংস্কৃতি হলো থাকার বিষয়। আমরা প্রতিদিন যেভাবে বাঁচি এবং থাকি, সেই জীবনচর্চাই আমাদের সবচেয়ে বড় সংস্কৃতি।
- ব্রিটিশ চিন্তাবিদ রেমন্ড উইলিয়ামসের লেখা “culture is ordinary”-এর আলোকে।
রেমন্ড উইলিয়াম্স দেখান, সংস্কৃতি শুধু শিল্পকলা নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনযাপন—মানুষের কথা বলা, কাজ, পরিবার, উৎসব ও স্বপ্নের অভ্যাসের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। তিনি সমাজে প্রভাবশালী, অতীতের এবং নতুন উদীয়মান সংস্কৃতির সংঘর্ষ এবং ক্ষমতার লুকানো প্রভাব তুলে ধরেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে, সংস্কৃতি কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা দলকে নয়, মানুষের সাধারণ জীবনের সমষ্টিগত অভিজ্ঞতা ও চর্চার মাধ্যমে চিহ্নিত হয়। সূত্র: ‘অনন্ত লোকের স্পর্শ’- নামক ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

