বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রশিকা একসময় আর্থসামাজিক উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, সুশাসন, মানবাধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন ও ভোটাধিকারসহ নানা ইস্যুতে সক্রিয় ছিল। কিন্তু এখন প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় পৌঁছেছে। দুর্নীতি, অনিয়ম, আর্থিক অসংগতি ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের কারণে কার্যক্রম সীমিত হয়ে গেছে। বর্তমানে প্রশিকার কর্মকাণ্ড মূলত ক্ষুদ্রঋণ বিতরণে সীমাবদ্ধ এবং এই ব্যবস্থাপনাতেও চলছে লাগামহীন অনিয়ম। এছাড়া প্রধান নির্বাহী নিয়োগের ক্ষেত্রে সংস্থাটি নিয়মকানুনও মানছে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রশিকা দীর্ঘদিন ধরে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) অনুমোদন ছাড়া সদস্যদের কাছ থেকে মেয়াদি আমানত সংগ্রহ করছে। নিয়ম অনুযায়ী কোনো ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের আমানতের পরিমাণ তার নিজস্ব পুঁজির ৫০ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। কিন্তু প্রশিকার পুঁজি মাত্র ১৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। তবু প্রতিষ্ঠানটি আমানত সংগ্রহ করেছে তার চেয়ে ৫৬ গুণেরও বেশি। এমআরএ বলছে, এ ধরনের মেয়াদি আমানত গ্রাহকের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা মেয়াদি আমানত ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে, কিন্তু প্রশিকা তা মানছে না। বরং মাসিক সঞ্চয়, দ্বিগুণ মুনাফা, মাসিকভিত্তিক মুনাফা এবং ‘লাখপতি স্কিম’-এর মতো অনুমোদনবিহীন আমানত সংগ্রহ এখন তাদের রুটিন কাজ হয়ে গেছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত প্রশিকা ২৯৪ কোটি টাকা মেয়াদি আমানত সংগ্রহ করেছিল। ২০২২ সালে তা বেড়ে ৪৮৬ কোটি, ২০২৩ সালের জুনে ৭০৯ কোটি এবং ২০২৪ সালের ৩০ জুনে ৮১৩ কোটি টাকায় পৌঁছায়। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি তারল্য সঞ্চয় সংক্রান্ত নিয়মও মানছে না। ২০২৪ সালের ৩০ জুনের হিসাব অনুযায়ী এক হাজার ২৩০ কোটি টাকার মোট আমানতের বিপরীতে তারল্য সঞ্চিতি ছিল মাত্র চার কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এটি প্রয়োজনীয় পরিমাণের মাত্র শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ।
এমআরএ বিধিমালা অনুসারে মোট সদস্যের ৭০ শতাংশকে ঋণগ্রহীতা হতে হবে। কিন্তু ২০২৪ সালের জুনের তথ্যানুযায়ী প্রশিকায় ঋণগ্রহীতা সদস্যের হার ছিল মাত্র ৪৬ শতাংশ। প্রধান নির্বাহী (সিইও) নিয়োগ ও মেয়াদ বাড়ানোর ক্ষেত্রে ‘কর্মী নীতিমালা ও বেতন কাঠামো’ নিয়ম ভঙ্গ করছে প্রশিকা। নীতিমালা অনুযায়ী, সিইও-এর অবসরের বয়সসীমা ৬৫ বছর এবং অবসরের পর সর্বোচ্চ দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া যায়।
তবে ২০১৮ সালে ৬৫ বছর পূর্ণ করা প্রধান নির্বাহী সিরাজুল ইসলামকে চুক্তিভিত্তিক না রেখে নিয়মিত কর্মী হিসেবে বহাল রেখেছে বোর্ড। এরপর ২০২৩ সালের জুনে তার মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৭ পর্যন্ত করা হয়েছে। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) বারবার তার নিয়োগকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করেছে। তবু প্রশিকা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো নীতিমালা সংশোধন করে চুক্তিভিত্তিক এক মেয়াদে নিয়োগের বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়েছে। মূলত সিরাজুল ইসলামকে প্রধান নির্বাহী হিসেবে বহাল রাখতে বোর্ড এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া গাড়ি ক্রয়, অফিস ভাড়া, কর্মকর্তাদের আর্থিক সুবিধা প্রদানের মতো বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে।
এর প্রেক্ষিতে এমআরএ ৩০ অক্টোবর প্রশিকার গভর্নিং বোর্ডে একজন পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে। এক বছরের জন্য এই দায়িত্ব পেয়েছেন এমআরএর পরিচালক মোহাম্মদ কামাল হোসেন। তিনি জানান, তার কাজ হবে এমআরএর নির্দেশনা এবং প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব নীতিমালা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করা। প্রশিকার চেয়ারম্যান রোকেয়া ইসলাম ফোনে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে কথা বলতে চাইলেও তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। প্রধান নির্বাহী সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে জানানো হয়, তিনিও কোনো মন্তব্য করবেন না।
ভাইস চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম বলেন, কর্মীর অবসরের বিষয়টি বোর্ডের কাছে জানা ছিল না। তাই তারা সিরাজুল ইসলামকে নিয়োগ দিয়েছেন। এমআরএ থেকে বিষয়টি জানানো হয়েছে, এখন তাকে অবসরে পাঠানো হবে। গভর্নিং বডির সদস্য আসলাম উদ্দিন জানান, বিষয়টি বোর্ড জানত না। ভুলবশত মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। পরবর্তী সভায় বিষয়টি আলোচনা করা হবে এবং অনিয়মের মাধ্যমে নেওয়া বেতন-ভাতা ফেরত চাওয়া হবে। শনিবার (১৫ নভেম্বর) গভর্নিং বডির সভা অনুষ্ঠিত হবে। প্রশিকার নেতৃত্ব নিয়েও বড় ধরনের দ্বন্দ্ব ও আইনি জটিলতা রয়েছে। বর্তমানে রোকেয়া ইসলাম গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে এক সময় আলোচিত-সমালোচিত ড. কাজী ফারুক আহমেদ ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান।
২০০৮ সালে তিনি ‘ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলন’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। নির্বাচনে তিনটি আসনে অংশ নিয়ে জামানত হারান তিনি। ওই নির্বাচনে প্রশিকার তহবিল ব্যবহারের অভিযোগও ওঠে। ২০০৯ সালে রাজনৈতিক দলের কারণে গভর্নিং বডির সদস্যরা তার বিরুদ্ধে অনাস্থা জানিয়ে তাকে চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণ করেন। তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আবদুল ওয়াদুদ চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। কাজী ফারুক চেয়ারম্যানশিপ ফিরে পেতে আদালতে মামলা করেন, কিন্তু এখনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
প্রশিকার প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ২০১২ সালে কাজী ফারুক তার অনুসারীদের নিয়ে অফিস দখল করার চেষ্টা করেন। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা তার সঙ্গে ছিল না। ফলে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়। কর্মীদের বেতন না দেওয়া, শাখা অফিসে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত না দেওয়ার মতো অনিয়মের কারণে এক সময় তার অনুসারীরাও তাকে ছেড়ে চলে যান। বাধ্য হয়ে কাজী ফারুক অফিস ছাড়েন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান রোকেয়া ইসলাম।
কাজী ফারুক আহমেদ বড় ধরনের আলোচনায় আসেন ২০০৪ সালে। তখন তিনি আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলের ‘ট্রাম্প কার্ড’ ইস্যুতে কর্মীদের ঢাকায় জড়ো করে চারদলীয় জোট সরকারকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের ষড়যন্ত্র করেছিলেন। তবে ষড়যন্ত্রটি ব্যর্থ হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কাজী ফারুক প্রশিকাকে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে ব্যবহার করেছেন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন তৎপরতা চালিয়েছেন। ১৯৯৬ সালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ‘জনতার মঞ্চ’ গঠনে তার ভূমিকা ছিল। এনজিও সমিতি অ্যাডাবের চেয়ারম্যান হিসেবেও প্রভাব খাটিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। এসব বিষয়ে কাজী ফারুকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রশিকার গভর্নিং বডির সদস্য আসলাম উদ্দিন বলেন, “কাজী ফারুকের হাত ধরে প্রশিকার উত্থান হয়েছিল, আবার তার হাত ধরেই প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংসের মুখে।“
প্রশিকার সার্বিক অনিয়মের বিষয়ে এমআরএর নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন জানান, গভর্নিং বডির বিরোধের কারণে আদালত অবমাননার মতো ইস্যু থাকতে পারে। তাই বিগত বছরগুলোতে এমআরএ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, তাই নিয়ম মেনে চলার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। তবে আমানত সংগ্রহ, সঞ্চয় রাখা ও অন্যান্য অনিয়ম প্রমাণ হওয়ায় পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, প্রশিকা ১৯৭৬ সালে গ্রামীণ মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, স্বাস্থ্য সচেতনতা, দক্ষতা উন্নয়ন, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও সামাজিক কর্মসূচির মাধ্যমে এনজিও হিসেবে পথচলা শুরু করে। পরে ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংক ও আশার মতো প্রতিষ্ঠানের মডেল অনুসরণ করে ১৯৯৯ সালে আমানত সংগ্রহ ও সুদভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম শুরু করে। ২০১৩ সালে এমআরএ থেকে স্থায়ী নিবন্ধন লাভ করে। বর্তমানে দেশে ৭০০ ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রশিকার কার্যক্রম রয়েছে।

