মানুষের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হলো জীবনবিমা। কিন্তু দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, বিনিয়োগে অস্বচ্ছতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএর দুর্বল তদারকি এই ভরসাকে ক্রমেই সংকুচিত করেছে। মানুষের আস্থা কমে যাওয়ায় খাতটি ধীরে ধীরে সংকটে পৌঁছেছে।
গত আড়াই বছরের হিসাব স্পষ্ট দেখাচ্ছে—জীবনবিমায় আস্থাহীনতা জমেছে, অসন্তোষ সঞ্চিত হয়েছে, এবং তা এখন দৃশ্যমান সংকটে রূপ নিয়েছে। এই সময়ে সক্রিয় পলিসি কমেছে ১০ লাখ ২৫ হাজার ৯২৪টি। কমার হার ১৩.১৪ শতাংশ। এর অর্থ, মানুষ নতুন করে বিমার জালে জড়াচ্ছে না, বরং পুরোনো পলিসি বাতিল করছে।
আইডিআরএর সর্বশেষ বার্ষিক ও অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে মোট ৩৬টি জীবনবিমা কোম্পানি রয়েছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে এসব প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় পলিসি ছিল ৭৮ লাখ ৯ হাজার ১২১টি। ২০২৩ সালে তা কমে আসে ৭৩ লাখ ৭৮ হাজার ২৭৬টিতে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কমে দাঁড়ায় ৭০ লাখ ৮৯ হাজার ৭৭৭টিতে। এক বছরে কমেছে ৭ লাখ ১৯ হাজার ৩৪৪টি পলিসি। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই, ২০২৫ সালের জুনে পলিসি সংখ্যা আরও কমে ৬৭ লাখ ৮৩ হাজার ১৯৭টিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এই অর্ধবছরে কমেছে ৩ লাখ ৬ হাজার ৫৮০টি পলিসি। ফলে নতুন পলিসি নেওয়ার বদলে অনেকে পুরোনো পলিসি বাতিল করছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক মাইন উদ্দিন বলেন, “দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগার কারণে মানুষ বিমা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। বছর ধরে নিজের প্রাপ্য টাকা না পেলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বিমা থেকে দূরে থাকে।”
আইডিআরএর তথ্যানুসারে, পলিসি কমার শীর্ষে রয়েছে সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্স। প্রতিষ্ঠানটির বিমা কমেছে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৬৬৮টি। ডেলটা লাইফের কমেছে ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৬৮টি। পপুলার লাইফের কমেছে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৯টি। এর পরে রয়েছে ন্যাশনাল লাইফ, প্রগতি লাইফ এবং আলফা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স লিমিটেড।
চার্টার্ড লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির সিইও এস এম জিয়াউল হক বলেন, “ব্যবস্থাপনা কাঠামো দুর্বল হওয়ায় পুরো খাত সংকটের মুখে। বিনিয়োগ, দাবি নিষ্পত্তি ও গ্রাহকসেবা সবক্ষেত্রেই শক্তিশালী নীতিমালা প্রয়োজন।”
নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স প্রফেশনালস সোসাইটির (বিআইপিএস) সেক্রেটারি জেনারেল এ কে এম এহসানুল হক বলেন, “অনিয়মের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলেও তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয় না। এতে গ্রাহকের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
আইডিআরএর পরামর্শক সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, “খাতের বিচ্যুতি দূর করতে আইনি সংস্কার প্রক্রিয়াধীন। দাবি নিষ্পত্তি দ্রুত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নিয়মগুলো আরও স্পষ্ট করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু নির্দেশনা নয়—কার্যকর প্রয়োগই হবে মূল বিষয়। বিমা খাত মানুষের বিশ্বাসে টিকে থাকে। একবার বিশ্বাস নষ্ট হলে তা ফিরিয়ে আনা কঠিন। তাই দাবি নিষ্পত্তির সময়সীমা নির্ধারণ, বিনিয়োগের তথ্য প্রকাশ, স্বচ্ছ অডিট এবং শক্তিশালী নজরদারি জরুরি। এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতেই হবে।

