জীবন বিমা মানে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে আর্থিক নিরাপত্তা। এটি পরিবারকে অসুস্থতা, দুর্ঘটনা বা মৃত্যুতে আর্থিক সুরক্ষা দেয়—এই বিশ্বাসে মানুষ মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কষ্টার্জিত টাকা জমা রাখেন বিমা কোম্পানিতে।
কিন্তু বাংলাদেশে জীবন বিমার এই প্রতিশ্রুতি অনেক ক্ষেত্রেই পূরণ হয় না। বহু গ্রাহক বছরের পর বছর প্রিমিয়াম জমা দিয়ে ও মৃত্যু দাবি, মেয়াদপূর্তি বা সারেন্ডার ভ্যালুর টাকা পাননি। এটি দেশের জীবন বিমা খাতের বাস্তব চিত্র।
বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের অন্তত সাতটি জীবন বিমা কোম্পানির লাইফ ফান্ড শূন্য বা ঋণাত্মক অবস্থায় আছে। অথচ এসব কোম্পানির কাছে আটকে আছে অন্তত ১৩ লাখ গ্রাহকের ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি দাবি। কারও দাবি ঝুলে আছে পাঁচ বছর, কারও ১০ বছর। অনেক গ্রাহক এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নিজের টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। পাঁচ পর্বের এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের আজ প্রকাশিত হচ্ছে প্রথম পর্ব।
আইডিআরএ’র সেপ্টেম্বর প্রান্তিক হিসাব অনুযায়ী, দেশের ৩৬টি জীবন বিমা কোম্পানির লাইফ ফান্ডের মোট পরিমাণ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। তবে বেশ কয়েকটি কোম্পানির লাইফ ফান্ড কার্যত শূন্য। ফান্ডে টাকা না থাকায় নতুন দাবি এলেই তা পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এই বাস্তবতা নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকরা দ্বারে দ্বারে ঘুরেও টাকা পাচ্ছেন না। আইডিআরএ’র তথ্য অনুযায়ী, ৯টি কোম্পানির লাইফ ফান্ড খুবই নাজুক। এর মধ্যে ৭টির ফান্ডে এক টাকাও নেই। ম্যানেজমেন্টের অব্যবস্থাপনা ও মালিকদের লুটপাটের কারণে এই ফান্ড শূন্যে নামেছে। কিছু কোম্পানির লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক অবস্থায় চলে গেছে। তাই এই সাত কোম্পানির গ্রাহকরা আপাতত পাওনা টাকা পাচ্ছেন না।
বেক্সিমকো গ্রুপের ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে। মালিকদের লুটপাটের কারণে ফান্ড ফাঁকা হয়ে গেছে। লাইফ ফান্ড থেকে ৪৫৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা লোপ পেয়েছে। ভারপ্রাপ্ত সিইও মো. আব্দুর রহিম ভূঁইয়া বলেন, “আগের মালিকপক্ষের অব্যবস্থাপনা গ্রাহকের দাবি পরিশোধে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। ছোট অঙ্কের দাবি এখনও পরিশোধের চেষ্টা চলছে। দীর্ঘদিনের সংকটের কারণে গ্রাহকসেবা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হলেও পুনর্গঠন শুরু হয়েছে।”
ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন একাধিক সাবেক পরিচালক ও কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে ছিলেন মো. হেলাল মিয়া, শাহরিয়ার খালেদ, নাজনীন হোসেন, খন্দকার মোস্তাক মাহমুদ, মো. মনোয়ার হোসেন, কে. এম. খালেদ, এম. এ. খালেক, ইফফাৎ জাহান, মো. মিজানুর রহমান, মোজাম্মেল হোসেন, রাবেয়া বেগম, মো. মোশাররফ হোসেন, কাজী ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ও সাবেক সিইও মো. হেমায়েত উল্লাহ। এছাড়াও পদক্ষেপে ছিলেন সৈয়দ আবদুল আজিজ, প্রকৌশলী আমির হোসেন, তাসলিমা ইসলাম, সাবিহা খালেক, সারওয়াৎ খালেদ সিমিন, মো. আজহার খান, মো. সোহেল খান, গোলাম কিবরিয়া ও এস. এম. মোর্শেদ।
পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সেও ফান্ড শূন্য। ফান্ড থেকে ৩০৬ কোটি টাকা অন্য খাতে চলে গেছে। সিইও আবু মুসা সিদ্দিকী বলেন, “প্রকৃত সমস্যা হলো নগদ অর্থের ঘাটতি। কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকের দাবি পরিশোধের চেষ্টা চলছে। প্রিমিয়াম আদায় থেকেও অর্থ দেওয়া হচ্ছে।”
বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্সের ফান্ডেও শূন্য। অতিরিক্ত ৬৫ কোটি টাকা ফান্ড থেকে সরানো হয়েছে। নতুন সিইও নূর মোহাম্মদ ভূইয়া জানান, প্রতিষ্ঠানটি পুনর্গঠনের জন্য ১৬টি স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। প্রবাসীদের জন্য বিশেষ পণ্য চালু এবং অটোমেশন জোরদার করা হচ্ছে।
শান্তা লাইফ ইনস্যুরেন্সের ফান্ড থেকে ১০ কোটি ৯২ লাখ টাকা অন্য খাতে খরচ হয়েছে। সিইও নাফিস আকতার আহমেদ বলেন, “নতুন প্রতিষ্ঠানে লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক থাকা স্বাভাবিক। তবে আমরা ধারাবাহিকভাবে ফান্ড ইতিবাচক অবস্থায় নেওয়ার চেষ্টা করছি।”
স্বদেশ লাইফ ইনস্যুরেন্সের ফান্ড থেকে ৫ কোটি ১১ লাখ টাকা সরানো হয়েছে। সিইও এ কে কাওসার জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন ও গ্রাহকবান্ধব করার কাজ শুরু হয়েছে। মালিকপক্ষ থেকে পেইড-আপ ক্যাপিটাল পাওয়ার মাধ্যমে আর্থিক সংকট কাটানোর চেষ্টা চলছে।
প্রোটেকটিভ ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের ফান্ড শূন্য এবং ৮১ লাখ টাকা ঋণাত্মক। যমুনা লাইফ ইনস্যুরেন্সের ফান্ডও ৭৩ লাখ টাকা ঋণাত্মক। সিইও অজিত চন্দ্র আইচ বলেন, “ঋণাত্মক ফান্ডে গ্রাহকের স্বার্থ পূর্ণাঙ্গভাবে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব নয়। ফান্ড শক্তিশালী করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।”
আইডিআরএ’র এক কর্মকর্তা বলেন, “লাইফ ফান্ড শূন্য মানে কোম্পানি কার্যত দেউলিয়া। কিন্তু লাইসেন্স বাতিল বা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা নেই।” গোল্ডেন লাইফ ইনস্যুরেন্সের ফান্ডে ৬ কোটি টাকা থাকলেও ৪১ কোটি টাকা গ্রাহকের আটকা। প্রগ্রেসিভ লাইফে ফান্ডে ৭৯ কোটি টাকা থাকলেও গ্রাহকের ১৫৩ কোটি টাকা আটকা। সানফ্লাওয়ার লাইফ ইনস্যুরেন্সের ফান্ডে ৮০ কোটি টাকা থাকলেও গ্রাহকের ১৯০ কোটি টাকার বেশি পাওনা।
লাইফ ফান্ড হলো জীবন বিমা কোম্পানির প্রাণ। এটি নির্ধারণ করে গ্রাহকের টাকা কতটা নিরাপদ এবং ভবিষ্যতে দাবি পরিশোধে কতটা সক্ষম। ফান্ড শূন্য বা ঋণাত্মক হওয়া জীবন বিমা খাতের জন্য উদ্বেগজনক সংকেত। খাতের প্রধান নির্বাহীরা বলছেন, লাইফ ফান্ড রক্তের মতো। রক্তশূন্য অবস্থায় মানুষ টিকে থাকতে পারে না; ফান্ড ঋণাত্মক হলে কোম্পানি কার্যত অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। এতে গ্রাহকের টাকা মারাত্মক ঝুঁকিতে এবং দাবি পরিশোধে তীব্র অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
পাঁচ কোম্পানিতে আটকা সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা:
বিমা আইন অনুযায়ী, পলিসি ম্যাচিউর হওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে দাবি নিষ্পত্তি করা বাধ্যতামূলক কিন্তু বাস্তবে আইন কাগজেই সীমাবদ্ধ। আইডিআরএ’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে জীবন বিমা খাতে মোট দাবির পরিমাণ ৫ হাজার ৯৮৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে অনিষ্পন্ন দাবি দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৮৮০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। বিশেষ করে মাত্র পাঁচটি জীবন বিমা কোম্পানিতে আটকে আছে ৩ হাজার ৪২৬ কোটি টাকার বেশি, যা অনিষ্পন্ন দাবির প্রায় ৮৮ শতাংশ।
ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স অনিষ্পন্ন দাবিতে শীর্ষে। কোম্পানিটির মোট দাবি ২ হাজার ৮১৫ কোটি ১ লাখ টাকা, যার মধ্যে ২ হাজার ৭৮০ কোটি ৫ লাখ টাকা এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে দাবি পরিশোধের হার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।
দ্বিতীয় অবস্থানে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স। মোট দাবি ২৫৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা, যার মধ্যে ২৫৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা অনিষ্পন্ন।
তৃতীয় অবস্থানে সানফ্লাওয়ার লাইফ ইনস্যুরেন্স। মোট দাবি ১৯৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা, এর মধ্যে ১৯০ কোটি ৫৮ লাখ টাকারও বেশি এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।
চতুর্থ অবস্থানে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইনস্যুরেন্স। মোট দাবি ১৬২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা, এর মধ্যে ১৫৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকার অনিষ্পন্ন। এ অবস্থায় কোম্পানিটির দাবি পরিশোধ সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পঞ্চম অবস্থানে রাষ্ট্রায়ত্ত জীবন বীমা করপোরেশন। মোট দাবি ২৩৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা, এর মধ্যে ৯৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হলেও এত অঙ্কের দাবি ঝুলে থাকার কারণে সমালোচনা রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সাবেক সিইও বলেন, “প্রায় কোনও কোম্পানি নিয়ম অনুযায়ী দাবি পরিশোধ করছে না। হাতে গোনা কয়েকটিকেই ভালো বলা হয়, তারা ৯০ দিনের সুযোগ নিয়ে বিলম্ব করছে। বেশিরভাগ কোম্পানিতে গ্রাহক ঠকানোর সংস্কৃতি চলছে।” বছরের পর বছর প্রিমিয়াম পরিশোধ করেও মৃত্যু দাবি, মেয়াদপূর্তির অর্থ বা সারেন্ডার ভ্যালু সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল তদারকি, কোম্পানিগুলোর অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির সুযোগে সংকট গভীরে পৌঁছেছে।
একাধিক ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে একই চিত্র—দাবি পেতে কেউ বছরের পর বছর বিমা অফিসে ঘুরছেন, কেউ আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন, কেউ মামলা করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে ‘অসম্পূর্ণ কাগজপত্র’ দেখিয়ে একাধিকবার দাবি ফেরত পাঠানো হয়েছে, যেন গ্রাহককে ক্লান্ত করাই মূল উদ্দেশ্য।
প্রোগ্রেসিভ লাইফে বছরব্যাপী আটকা গ্রাহকের টাকা:
প্রোগ্রেসিভ লাইফ ইন্সুরেন্সে পলিসি করা পাবনার ভুক্তভোগী ইউসুফ আলী মিয়া জানান, তার পলিসির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২১ সালে। দীর্ঘদিন ধরে কোম্পানির অফিসে ঘুরলেও তিনি নিজের জমানো টাকা ফেরত পাননি। কখনও বলা হয়েছে—আগামী মাসে আসতে, কখনও—চেক হয়নি, আবার কখনও—ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নেই।
ইউসুফ আলী মিয়া বলেন, “শুধু হয়রানি। টাকা ফেরত দেওয়ার কোনও সদিচ্ছাই নেই।” নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ-র কাছে অভিযোগ করেও কোনও সুফল পাননি। তিনি জানান, গ্রাহককে টাকা দিতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটি পাবনা অফিস বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে তিনি প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে ঢাকায় হেড অফিসে ঘুরছেন। প্রায় একই অভিজ্ঞতা পান পাবনার খুশবু আরা ও তার পরিবার। শুধু ইউসুফ আলী মিয়া নন, প্রোগ্রেসিভ লাইফে পলিসি করা পাবনার ২২ জন ভুক্তভোগীও আইডিআরএ’র কাছে অভিযোগ করলেও কোনও সুফল পাচ্ছেন না।
আইডিআরএ’র সেপ্টেম্বর প্রান্তিক হিসাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিতে মেয়াদোত্তীর্ণ গ্রাহকের ১৫৩ কোটি টাকা আটকে আছে। যদিও কোম্পানির লাইফ ফান্ডে আছে মাত্র ৭৯ কোটি টাকা। প্রোগ্রেসিভ লাইফ ইন্সুরেন্সের চেয়ারম্যান বজলুর রশিদ বলেন, “আমরা গ্রাহকদের টাকা দেওয়ার চেষ্টা করছি। তবে আগের পর্ষদের লোকেরা লুটপাট করার কারণে আর্থিক সমস্যা তৈরি হয়েছে। আমরা এসে এটাকে ঠিকঠাক করার চেষ্টা করছি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতার সুযোগে আমাদের প্রতিষ্ঠান দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। এখন যতটুকু পারছি, গ্রাহকদের দাবি পরিশোধের চেষ্টা চালাচ্ছি।”
কাগজে অফিস, বাস্তবে তালা:
বিমা কোম্পানির অনেক শাখা কাগজে থাকলেও বাস্তবে নেই। কোথাও অফিস থাকলেও কর্মকর্তা নেই, কোথাও আবার তালা ঝুলছে। প্রোগ্রেসিভ লাইফ ইনস্যুরেন্সের পাবনা অফিসও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পুরো জেলায় কোনও কর্মকর্তা নেই। তবুও প্রিমিয়াম আদায় থেমে নেই। এজেন্টদের মাধ্যমে প্রিমিয়াম আদায় হচ্ছে নিয়মিত। পাবনার আটঘড়িয়ায় একটি এজেন্টকে খুঁজে পায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, গত প্রায় দুই বছর ধরে পাবনার কেউ দাবির টাকা পাচ্ছে না।
“যাদের দুই-তিন কিস্তি বাকি আছে, তারা আগের মতোই টাকা জমা করছেন কিন্তু অফিসে তালা থাকায় সমস্যা হচ্ছে। গ্রাহকরা আমার এবং আমার পরিবারের ওপর সামাজিক ও মানসিক চাপ তৈরি করে হয়রানি করার চেষ্টা করছেন,” বলেন এজেন্ট।
চেকই নতুন ঝুঁকি, গ্রাহকের দীর্ঘ অপেক্ষা:
প্রোগ্রেসিভ লাইফ ইনস্যুরেন্সের পাবনা শাখায় পলিসি খোলা গ্রাহক রফিকুল ইসলাম জানান, ২০২২ সালে ম্যাচিওর হওয়া পলিসির টাকা পাওয়ার জন্য গত চার বছর ধরে হেড অফিসে ঘুরেছেন। গত ডিসেম্বরে তিনি প্রতিষ্ঠানটির এমডির দফতরে পৌঁছানোর সুযোগ পান। ছয় মাস পরে টাকা ওঠানোর জন্য একটি চেক দেওয়া হয়েছে কিন্তু রফিকুলের আশঙ্কা, এই চেকই তাকে নতুন ভোগান্তিতে ফেলবে। কারণ, চেক ডিজঅনার এখন বিমা খাতের নতুন প্রতারণার রূপ। শুধু প্রোগ্রেসিভ লাইফ নয়, বেশিরভাগ জীবন বিমা কোম্পানিই এখন গ্রাহককে তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে ছয় মাস সময় দিয়ে চেক দেওয়ার রীতি চালু করেছে।
অ্যাকাউন্টে অর্থ না থাকায় চেক ডিজঅনার:
মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পরও বিমার টাকা না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সানলাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড-এর মেহেরপুর জোনের একাধিক গ্রাহক। অভিযোগ রয়েছে, দাবি পরিশোধের নামে গ্রাহকদের চেক দেওয়া হলেও ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় একের পর এক চেক ডিজঅনার হয়েছে।
এই ঘটনায় প্রতারণার অভিযোগ এনে ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই সানলাইফ ইনস্যুরেন্সের বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন মেহেরপুর জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম। নোটিশে বলা হয়, মেহেরপুর জোনের গ্রাহকরা মেয়াদোত্তীর্ণ পলিসির দাবি পরিশোধের জন্য আবেদন করলে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ তাদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকের চেক ইস্যু করেছে কিন্তু চেক ব্যাংকে উপস্থাপন করলে অর্থ না থাকায় সেগুলো ডিজঅনার হয়। এতে গ্রাহকের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। নোটিশে এ ঘটনাকে প্রতারণা হিসেবে উল্লেখ করে একে প্রচলিত আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ বলা হয়েছে।
নোটিশে মেহেরপুরের ২২ জন গ্রাহকের পলিসি নম্বর, ব্যাংকের নাম, চেক নম্বর ও পাওনা টাকার পরিমাণ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আইনি নোটিশের অনুলিপি বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও পাঠানো হয়েছে। অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম বলেন, “প্রতিষ্ঠানটির অনেক গ্রাহক এখনও পর্যন্ত পাওনা টাকা পাননি। যারা মামলা করেছেন, শুধু তারাই টাকা পেয়েছেন।”
আবু ইউসুফের চোখে শুধু হতাশা:
একসময় ভালো বিমা কোম্পানি হিসেবে পরিচিত ছিল ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স কিন্তু ২০০০ সালের পর এটি মালিকদের লুটপাটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার আবু ইউসুফ ২০০৯ সালে ১০ বছর মেয়াদি একটি পলিসি কিনেছিলেন। নিয়মিত তিনি ৩ লাখ ৩৭ হাজার ২০০ টাকা জমা দিয়েছেন। ২০১৮ সালে সব কিস্তি পরিশোধ শেষ হলেও আজও তিনি দাবির টাকা পাননি।
ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও তিনি জানেন না—তার টাকা কোথায় আটকে আছে, কখন পাবেন, কিংবা কার কাছে গেলে সঠিক তথ্য মিলবে। আবু ইউসুফ বলেন, “ফারইস্ট লাইফ আমার জীবন তছনছ করে দিয়েছে। এখন আমার কাছে বিমা মানেই প্রতারণা।”
আবু ইউসুফের মতো কয়েক লাখ গ্রাহক বছরের পর বছর একই অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। রংপুরের গঙ্গাচড়ার বাসিন্দা আবু হেনা ২০১১ সালে ফারইস্ট ইসলামী লাইফে একটি জীবন বিমা পলিসি করেন। ২০১৮ সালে তার স্ত্রীর মৃত্যু হলেও সব কাগজপত্র জমা দিয়েও আজ পর্যন্ত দাবি পাননি। তিনি বলেন, “অফিসে গেলে বলে—ফাইল প্রসেসিংয়ে আছে। সাত বছর ধরে শুধু শুনছি।” এমন গল্প একটির নয়—হাজারো। ভুক্তভোগী গ্রাহকদের পাওনা টাকা না দেওয়ায় গত দুই-তিন বছরে প্রতিষ্ঠানটির অসংখ্য কর্মকর্তা পালিয়ে গেছেন। কিছু শাখা ও জোনাল অফিসও বন্ধ হয়ে গেছে।
গত বছরের অক্টোবরে গ্রাহকদের টাকা ফেরত না দিয়ে রাতের আঁধারে পালানোর সময় ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের রংপুর জোনাল অফিসের সামনে ট্রাক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আটক করে বিক্ষোভ দেখান গ্রাহকরা। প্রতারিত গ্রাহকরা যেন হেড অফিসে ঢুকতে না পারেন, সেজন্য প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তারা পুলিশি পাহারায় অফিস চালাচ্ছেন।
এক যুগের অপেক্ষা, বিমার টাকা ফেরে না:
এক যুগ আগে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া পলিসির টাকার জন্য অন্তত এক লাখ গ্রাহক এখনও অপেক্ষায় রয়েছেন। রংপুরের আসমা আক্তার ফারইস্ট লাইফের একটি পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৬ বছর পরও এখনো একটি টাকাও ফেরত পাননি।
আইডিআরএ’র তথ্য অনুযায়ী, ফারইস্ট লাইফের কাছে ১ লাখ ৬১ হাজার গ্রাহকের ২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকার দাবি ঝুলে আছে। অথচ প্রতিষ্ঠানটির লাইফ ফান্ড পুরোপুরি শূন্য। এক যুগের বেশি সময় গ্রাহকদের অপেক্ষা করানো কোম্পানির সংখ্যা ঠিক জানা না গেলেও আইডিআরএ’র তালিকায় সবচেয়ে বিপর্যস্ত কোম্পানি হলো ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২ হাজার ৮১৫ কোটি টাকার দাবির মধ্যে মাত্র ৩৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা পরিশোধ হয়েছে। ফলে দাবির প্রায় ৯৯ শতাংশ এখনও বকেয়া। আইডিআরএ’র মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, “ফারইস্ট লাইফসহ কয়েকটি কোম্পানির টাকা বাইরে চলে গেছে। তারা এখন আর দাবি পরিশোধ করতে পারবে না।”
তথ্য অনুযায়ী, বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্সের কাছে গ্রাহকের পাওনা ৭৯ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২০১৩ সালে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে কিছু গ্রাহকের পলিসি। প্রতিবেদক এই প্রতিষ্ঠানটির ৪ জন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলেন—কুড়িগ্রামের ফরমান আলী, রংপুরের রাবেয়া বেগম, আবদুল বারি ও আইবেলী। তারা এক যুগ ধরে পাওনা টাকার জন্য অপেক্ষা করছেন।
ভুক্তভোগীরা জানান, “প্রিমিয়াম নেওয়ার সময় কোম্পানির লোকজন খুব আন্তরিক ছিলেন কিন্তু দাবির সময় ফোনও ধরেন না।” গত ১২ বছর ধরে তাদের কেউই পাওনা টাকা পাননি। এছাড়া ২০১৪ ও ২০১৫ সালে ম্যাচিউর হওয়া গ্রাহকও এই তালিকায় রয়েছেন। শুধু বায়রা লাইফের ৫২ জন গ্রাহকের নথি এসেছে, যারা ২০০৩ ও ২০০৪ সালে ১০ বছর মেয়াদি পলিসি করেছেন।
বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ ভূইয়া বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে আমাদের বিভিন্ন এলাকার অফিস বন্ধ থাকায় গ্রাহকদের হয়রানি হয়েছে। তবে আমরা এর প্রতিকার খুঁজছি। আশা করছি, কিছু সময় লাগলেও গ্রাহকদের পাওনা মিটিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।” আইডিআরএ’র কর্মকর্তারা বলছেন, এই মুহূর্তে বায়রা লাইফের পক্ষে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব নয়। কারণ প্রতিষ্ঠানটির লাইফ ফান্ডে কোনও টাকা নেই।
আইডিআরএ’র উপপরিচালক মো. সোলায়মান বলেন, “আমাদের প্রধান লক্ষ্য গ্রাহকের দাবি পরিশোধ নিশ্চিত করা। ইতোমধ্যে কয়েকটি কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। সমস্যা চিহ্নিত করা হচ্ছে। এরপরও যারা ব্যর্থ হবে, প্রয়োজনে কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়া হবে।”

