হাজার কোটি টাকার অনিষ্পন্ন দাবি, ক্রমবর্ধমান পলিসি ল্যাপস এবং গ্রাহকের আস্থার সংকট—এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে ২০২৫ সাল পার করছে বাংলাদেশের বীমা খাত।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জীবন বীমা খাতে এখনও ৩ হাজার ৮৮০ কোটি টাকার দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে। সাধারণ বীমা খাতে অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ ৩ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা, যা খাতের আর্থিক সক্ষমতা ও সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো।
২০২৪ সালে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর মোট প্রিমিয়াম আয়ের পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। এর আগে, ২০২৩ সালে আয় ছিল ১২ হাজার ২৭৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, যা প্রায় ৭০ কোটি টাকা কম। আরও দেখা গেছে, ২০২৪ সালে লাইফ ফান্ডে জমা পড়েছে মাত্র ৪১৫ কোটি টাকা, যেখানে ২০২৩ সালে তা ছিল ৯০৩ কোটি টাকা। বছরের শেষে লাইফ ফান্ডে জমা পড়া অর্থ অর্ধেকেরও কম।
২০২৫ সালের জুন ও সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে জীবন বীমা কোম্পানিগুলো প্রিমিয়াম পেয়েছে যথাক্রমে ২ হাজার ৮৬১ কোটি ও ৩ হাজার ৫০ কোটি টাকা। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের তথ্য এখনও প্রকাশিত হয়নি। গড় হিসাবেও দেখা যায়, ২০২৫ সালের প্রিমিয়াম আয়ের ধারা কমেছে।
আইডিআরএ জানিয়েছে, ২০২৪ সালের শেষে জীবন বীমা খাতে অনিষ্পন্ন দাবি ছিল প্রায় ৪ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা। যদিও ২০২৫ সালে কিছু দাবি নিষ্পত্তি হয়েছে, বছরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বিপুল অঙ্কের অর্থ এখনও পলিসিধারীদের হাতে পৌঁছায়নি। তৃতীয় পর্ষদে জীবন বীমা খাতে দাবি দাঁড়ায় ৫ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকায়, যার মধ্যে মাত্র ২ হাজার ১০৬ কোটি টাকার পরিশোধ হয়েছে। ফলে বাকি রয়েছে ৩ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা।
নন লাইফ বীমা খাতেও অবস্থা ক্রমেই উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালে ৩ হাজার ৮৭২ কোটি টাকার দাবি থাকলেও, মাত্র ৩১ শতাংশ অর্থ পরিশোধ হয়েছিল। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নন লাইফ খাতের ৩ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকার দাবির মধ্যে মাত্র ২৭৪ কোটি টাকা (৭ শতাংশ) পরিশোধ হয়েছে। ৪৬টি কোম্পানির মধ্যে বাকি ৩ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা এখনো বকেয়া।
দাবি নিষ্পত্তিতে এই দীর্ঘসূত্রতা গ্রাহকের মধ্যে বীমা খাতের প্রতি অনাস্থা বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এস এম নুরুজ্জামান খানের মতে, সময়মতো দাবি না পাওয়া গ্রাহক নতুন পলিসি কেনার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করছে। তিনি বলছেন, কোম্পানিগুলোকে ব্যয় সংকোচনসহ কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। দাবি সংকটের পাশাপাশি উদ্বেগ বাড়াচ্ছে পলিসি ল্যাপস ও বাতিলের প্রবণতা।
২০২৪ সালের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালেও কয়েক লাখ জীবন বীমা পলিসি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বন্ধ হয়ে গেছে। ২০২৪ সালে ইনফোর্স পলিসি ছিল ৭০ লাখের বেশি, যেখানে ২০২৫ সালের ৯ মাসে তা দাঁড়িয়েছে ৬৮ লাখ ১১ হাজারের বেশি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয়ের সংকট এবং দাবি না পাওয়ার আশঙ্কাকে খাত বিশেষজ্ঞরা প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন। ২০২৪ সালে প্রিমিয়াম আয়ের প্রবৃদ্ধি তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে আসে। সেই দুর্বলতার প্রভাব ২০২৫ সালে কাটেনি। অনেক বীমা কোম্পানি নতুন গ্রাহক আকর্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে, একই সঙ্গে পুরোনো গ্রাহক ধরে রাখতেও সমস্যা হচ্ছে।
আইডিআর উদ্যোগ নিলেও মাঠ পর্যায়ে এর প্রভাব সীমিত। দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার সমাধান না হওয়া এবং দাবি নিষ্পত্তিতে দেরি বীমা খাতের আস্থা সংকট দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাশরুর রিয়াজ বলেন, বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী দেশগুলোর বীমা খাত তুলনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। কাভারেজ রেট কম, এবং রেগুলেটরি অথরিটির দুর্বলতা স্পষ্ট। তিনি মনে করেন, আগে পলিসি ও বাস্তবায়নের দুর্বলতা কাটিয়ে তুলতে হবে এবং দুর্নীতির লাগাম টানতে হবে। অন্যথায় খাতটি ২০২৫ সালেও নিম্ন আস্থা ও ধীরগতির বৃত্তেই আটকে থাকবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দ্রুত কাঠামোগত সংস্কার, শক্ত নিয়ন্ত্রণ এবং দাবি নিষ্পত্তিতে কঠোরতা না আনলে, বাংলাদেশের বীমা খাত ২০২৫ সালেও আস্থা সংকটের সঙ্গেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

