আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরকে ঘিরে রাজধানী ঢাকা ছাড়ার চিরচেনা দৃশ্য আবারও ফিরে এসেছে। বছরের এই সময়টায় শহরের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে, আর তার জায়গা নেয় এক অন্যরকম ব্যস্ততা—ঘরমুখো মানুষের ব্যস্ততা। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে লাখো মানুষ রাজধানী ছাড়ছেন, আর সেই যাত্রার অন্যতম বড় কেন্দ্র হয়ে উঠেছে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন।
গতকাল সোমবার, ১৬ মার্চ ছিল সরকারি অফিসের শেষ কর্মদিবস। দিনের কাজ শেষে রাত নামতেই কমলাপুর স্টেশনে শুরু হয় মানুষের ঢল। যেন পুরো শহর একসঙ্গে ট্রেন ধরতে এসেছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্ল্যাটফর্মে জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কেউ মেঝেতে বসে আছেন, কেউ ব্যাগের ওপর বসে অপেক্ষা করছেন, আবার কেউ পরিবার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ট্রেন আসার অপেক্ষায়।
মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ভোরেও সেই একই চিত্র চোখে পড়ে। সূর্য ওঠার আগেই স্টেশনে মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ছোট শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত, সবাই যেন একটাই উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে—যেভাবেই হোক বাড়ি পৌঁছাতে হবে ঈদের আগে। অনেকেই ভিড় এড়াতে ভোরে স্টেশনে চলে এসেছেন, কিন্তু তাতেও ভিড় এড়ানো সম্ভব হয়নি।
স্টেশনের ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যায় ঈদযাত্রার প্রকৃত চাপ কতটা। প্রতিটি ট্রেন যাত্রীতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে স্টেশন ছাড়ছে। অনেক যাত্রীকে দাঁড়িয়ে যাত্রা করতে হচ্ছে, আবার কেউ কেউ দরজার কাছেও জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। প্ল্যাটফর্মে হাঁটার মতো জায়গা খুঁজে পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে এই ভিড়ের মাঝেও একটি স্বস্তির দিক রয়েছে, যা যাত্রীদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। সেটি হলো—ট্রেনগুলো নির্ধারিত সময়েই ছেড়ে যাচ্ছে। ঈদের সময় সাধারণত ট্রেনের দেরি হওয়া খুবই সাধারণ ঘটনা হলেও এবার সেই চিত্র দেখা যায়নি। কোনো বড় ধরনের শিডিউল বিপর্যয় ছাড়াই ট্রেনগুলো একের পর এক সময়মতো ছেড়ে যাচ্ছে।
মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজশাহীগামী ধুমকেতু এক্সপ্রেস স্টেশন ছাড়ার মাধ্যমে দিনের ট্রেনযাত্রা শুরু হয়। এরপর যথাসময়ে ঢাকা ছাড়ে নীলনাগর, সুন্দরবন, এগারো সিন্দুর প্রভাতী এবং তিস্তা এক্সপ্রেসসহ অন্যান্য ট্রেন। এত বড় যাত্রীচাপ থাকা সত্ত্বেও এই সময়ানুবর্তিতা যাত্রীদের মধ্যে স্বস্তি এনে দিয়েছে।
স্টেশনে পরিবার নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন তাজুল ইসলাম। তিনি জানান, ভিড় হবে এটা আগেই ধারণা করেছিলেন, তাই একটু আগেভাগেই স্টেশনে চলে এসেছেন। তিনি আরও বলেন, স্টেশনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখে তিনি সন্তুষ্ট। বিশেষ করে বিনা টিকিটে কাউকে প্ল্যাটফর্মে ঢুকতে না দেওয়ার বিষয়টি তাকে আশ্বস্ত করেছে।
অন্যদিকে সুন্দরবন এক্সপ্রেসের যাত্রী আহসান হাবিব শিমুলের অভিজ্ঞতাও ছিল ইতিবাচক। তিনি জানান, পরিবারের সদস্যদের আগেই বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন, আর নিজে আজ রওনা দিচ্ছেন। তার কথায়, “ট্রেন ঠিক সময়ে আসায় খুব ভালো লাগছে। ভিড় থাকলেও যদি সময় ঠিক থাকে, তাহলে যাত্রা অনেক সহজ হয়ে যায়।”
এবারের ঈদযাত্রাকে সুশৃঙ্খল রাখতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং টিকিট চেকিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যা যাত্রী ব্যবস্থাপনায় বড় ভূমিকা রাখছে।
স্টেশনে প্রবেশের সময় থেকেই শুরু হচ্ছে টিকিট যাচাই। প্রথম ধাপে প্রবেশপথে টিকিট চেক করা হচ্ছে, এরপর প্ল্যাটফর্মে ঢোকার সময় আবার পরীক্ষা করা হচ্ছে। এর ফলে বিনা টিকিটে কেউ স্টেশনের ভেতরে ঢুকতে পারছে না। এতে যেমন ভিড় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে, তেমনি যাত্রীদের চলাচলও সুশৃঙ্খল হয়েছে।
ভ্রাম্যমাণ টিটিই আফতাব জানিয়েছেন, টিকিট ছাড়া কাউকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। তবে কিছু ক্ষেত্রে যাত্রীদের সুবিধার জন্য তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যদি কোনো পরিবারের সদস্য সংখ্যা টিকিটের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে নির্ধারিত ভাড়ায় স্ট্যান্ডিং টিকিট দেওয়া হচ্ছে। এতে করে কেউ যেন ভোগান্তিতে না পড়ে, সেই বিষয়টিও নিশ্চিত করা হচ্ছে।
স্টেশনের প্রবেশপথে দুই ধাপে টিকিট পরীক্ষা করার ফলে যাত্রীরা নির্ধারিত নিয়ম মেনে ট্রেনে উঠতে পারছেন। এতে হুড়োহুড়ি কমেছে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত হয়েছে।
ঈদের সময় ঘরমুখো মানুষের চাপ প্রতি বছরই থাকে, তবে এবারের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। এবার যাত্রীচাপ অনেক বেশি হলেও ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে যাত্রীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমে যাবে।
চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২০ বা ২১ মার্চ পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হওয়ার কথা রয়েছে। এবারের ঈদে শবে কদর এবং নির্বাহী আদেশের ছুটি মিলিয়ে সরকারি চাকরিজীবীরা টানা সাত দিনের ছুটি পেয়েছেন। এই দীর্ঘ ছুটিই মূলত যাত্রীচাপ বাড়ার অন্যতম কারণ।
গত ১৫ ও ১৬ মার্চ অফিস খোলা থাকায় অনেকেই তখন যাত্রা করতে পারেননি। ফলে ১৭ মার্চ ভোর থেকেই মূল যাত্রার চাপ শুরু হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ঈদের আগের দিন পর্যন্ত এই চাপ অব্যাহত থাকবে।
শুধু রেলওয়ে নয়, কমলাপুরের আশেপাশের বাস কাউন্টারগুলোতেও একই ধরনের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। দূরপাল্লার বাসগুলোতেও যাত্রীদের উপচেপড়া উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। অনেকে আবার বিকল্প হিসেবে বাস বা অন্যান্য যানবাহন বেছে নিচ্ছেন, কারণ ট্রেনের টিকিট পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এবারের ঈদযাত্রায় ভিড় থাকলেও বিশৃঙ্খলা তুলনামূলকভাবে কম। রেলওয়ের পরিকল্পনা ও নজরদারির কারণে যাত্রীরা কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছেন। তবুও সামনে আরও কয়েকদিন চাপ বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
ঈদ মানেই আনন্দ, আর সেই আনন্দের শুরু হয় ঘরে ফেরার মধ্য দিয়ে। হাজারো কষ্ট, ভিড় আর দীর্ঘ অপেক্ষার পরও মানুষ যখন ট্রেনে উঠে বসে, তখন তাদের চোখেমুখে যে স্বস্তি ও আনন্দ ফুটে ওঠে, সেটিই প্রমাণ করে—এই যাত্রা শুধু দূরত্ব পেরোনোর নয়, এটি আবেগেরও এক বিশেষ যাত্রা।

