মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতি ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন মোড় নিয়েছে ফ্রান্স। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, সেখানে সরাসরি জড়াতে চায় না প্যারিস।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি সচল করতে কোনো সামরিক অভিযানে ফ্রান্স অংশ নেবে না। তবে একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুদ্ধ শেষ হলে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগে নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত তাদের দেশ।
মঙ্গলবার মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে ফ্রান্সের মন্ত্রিসভার বৈঠকের শুরুতেই ম্যাক্রোঁ এই অবস্থান তুলে ধরেন। তার বক্তব্য ছিল স্পষ্ট ও কৌশলগত—বর্তমান সংঘাতে ফ্রান্স নিরপেক্ষ থাকতে চায় এবং কোনো পক্ষের হয়ে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপে অংশ নিতে রাজি নয়।
তিনি বলেন, ফ্রান্স এই যুদ্ধে কোনো পক্ষ নয়। তাই এই মুহূর্তে হরমুজ প্রণালিকে উন্মুক্ত করার জন্য কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া তাদের নীতির সঙ্গে যায় না। তার ভাষায়, “আমরা এই যুদ্ধের অংশ নই, তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন কোনো অভিযানে ফ্রান্স কখনোই যুক্ত হবে না।”
তবে ম্যাক্রোঁর অবস্থান শুধুই ‘না’ বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি একই সঙ্গে ভবিষ্যতের একটি পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেছেন। যুদ্ধ পরিস্থিতি শান্ত হলে, বিশেষ করে যখন বড় ধরনের হামলা বন্ধ হবে, তখন ফ্রান্স অন্যান্য দেশের সঙ্গে মিলিত হয়ে একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের চেষ্টা করছে—যার লক্ষ্য হবে হরমুজ প্রণালিতে আবারও নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করা।
ম্যাক্রোঁ বলেন, পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে ফ্রান্স প্রস্তুত থাকবে জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপত্তা বা এসকর্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে। তার এই বক্তব্যে বোঝা যায়, ফ্রান্স সরাসরি যুদ্ধের অংশ হতে চায় না, কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে আগ্রহী।
এই অবস্থানটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। এর আগে সোমবার হোয়াইট হাউসে এক অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, তিনি ম্যাক্রোঁর সঙ্গে কথা বলেছেন এবং হরমুজ প্রণালি সচল করতে মিত্রদের রাজি করানোর ক্ষেত্রে ম্যাক্রোঁর ভূমিকা “১০-এর মধ্যে ৮” নম্বর পাওয়ার মতো বলে মন্তব্য করেন।
ট্রাম্প তখন আশাবাদ প্রকাশ করেছিলেন যে, শেষ পর্যন্ত ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন প্রচেষ্টায় যোগ দেবে। কিন্তু মঙ্গলবারের বৈঠকে ম্যাক্রোঁর স্পষ্ট বক্তব্য সেই সম্ভাবনাকে কার্যত নাকচ করে দিয়েছে।
ফরাসি কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, প্যারিস এমন একটি জোট গঠনের চেষ্টা করছে যা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ছাড়াই হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে। অর্থাৎ, ফ্রান্স চায় এই ইস্যুতে একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গড়ে উঠুক, যেখানে একক কোনো দেশের আধিপত্য থাকবে না।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হিসেবে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অপরিসীম। এই পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস বিশ্ববাজারে পৌঁছে। ফলে এই প্রণালিতে যে কোনো অস্থিরতা সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে।
এই বাস্তবতায় ফ্রান্সের অবস্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে তারা যুদ্ধের বাইরে থাকতে চায়, অন্যদিকে ভবিষ্যতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত।
সব মিলিয়ে ম্যাক্রোঁর এই অবস্থান শুধু একটি সামরিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি একটি কূটনৈতিক বার্তা—ফ্রান্স যুদ্ধ নয়, বরং সমাধানের পথে থাকতে চায়।

