মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ এখন টানা ১৮ দিনে গড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা বাড়ছে, তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে, বিশ্ব শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে সাধারণত একটি জিনিস আমরা দেখতে অভ্যস্ত—সোনার দাম হঠাৎ করে লাফিয়ে ওঠে। কারণ, অনিশ্চয়তার সময়ে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
কিন্তু এবার যেন সেই চেনা দৃশ্য দেখা যাচ্ছে না। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি সংকট—সবকিছুর মাঝেও সোনার দাম আশ্চর্যজনকভাবে স্থির রয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, এত বড় সংকটের মাঝেও কেন সোনার দাম বাড়ছে না?
সোনার বর্তমান দাম কোথায় দাঁড়িয়ে?
সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম প্রায় একই জায়গায় ঘোরাফেরা করছে।
১৭ মার্চ পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী,
সোনার দাম ছিল প্রায় ৫,০০০ ডলার প্রতি আউন্সের কাছাকাছি।
স্পট গোল্ডের দাম দাঁড়িয়েছে ৫,০০১.৩৬ ডলার, আর এপ্রিল ডেলিভারির জন্য ফিউচারস গোল্ড সামান্য বেড়ে ৫,০০৫.২০ ডলার হয়েছে।
অর্থাৎ, বড় ধরনের ওঠানামা নেই—যা বর্তমান পরিস্থিতিতে বেশ অস্বাভাবিক।
সাধারণত কী হওয়ার কথা ছিল?
ইতিহাস বলছে, যখনই বড় কোনো যুদ্ধ বা বৈশ্বিক সংকট তৈরি হয়, তখন সোনার দাম দ্রুত বাড়ে।
উদাহরণ হিসেবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কথা বলা যায়। সেই সময় সোনার দাম হঠাৎ করেই বেড়ে গিয়েছিল, কারণ বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ বাজার থেকে টাকা সরিয়ে নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগ করতে শুরু করেছিল।
সোনাকে বলা হয় “সেফ হ্যাভেন অ্যাসেট”—অর্থাৎ এমন একটি সম্পদ, যেখানে সংকটের সময় মানুষ আশ্রয় নেয়।
কিন্তু ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে সেই প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না।
তাহলে কেন সোনার দাম বাড়ছে না?
এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের শক্তিশালী অবস্থান।
যখন ডলার শক্তিশালী থাকে, তখন সোনার দাম সাধারণত বাড়তে পারে না। কারণ সোনা আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারে লেনদেন হয়। ফলে ডলার শক্তিশালী হলে সোনা অন্য মুদ্রার বিনিয়োগকারীদের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি দামী হয়ে যায়।
এছাড়া ডলার নিজেই একটি “নিরাপদ বিনিয়োগ” হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে অনেক বিনিয়োগকারী সোনার বদলে ডলারে বিনিয়োগ করছেন।
সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তা
আরেকটি বড় কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নীতির প্রভাব।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে এখন এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে ফেড সুদের হার কমানোর পরিকল্পনা স্থগিত করতে পারে, এমনকি বাড়াতেও পারে।
যদি সুদের হার বাড়ে, তাহলে ব্যাংকে বা বন্ডে টাকা রেখে সুদ পাওয়ার সুযোগ বাড়ে। কিন্তু সোনায় বিনিয়োগ করলে কোনো সুদ পাওয়া যায় না।
ফলে বিনিয়োগকারীরা সোনার বদলে সুদবাহী সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
আগে থেকেই বেশি দামি ছিল সোনা
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো—এই বছর শুরু থেকেই সোনার দাম অনেক বেশি ছিল।
অর্থাৎ, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই সোনার দাম ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিল। ফলে নতুন করে বড় লাফ দেওয়ার মতো জায়গা কিছুটা কমে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
“আগে থেকেই এত বেশি দাম বাড়ার কারণে এখন সোনা যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় খুব বেশি নড়ছে না।”
সোনা এখন কতটা নিরাপদ?
একসময় সোনা ছিল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নিরাপদ বিনিয়োগ।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে সোনা আগের মতো স্থিতিশীল নেই। বরং এটি অনেকটাই “স্পেকুলেটিভ অ্যাসেট” বা অনুমানভিত্তিক বিনিয়োগে পরিণত হয়েছে।
অর্থাৎ, সোনার দাম এখন অনেকটাই বাজারের মনোভাব, ট্রেডিং এবং জল্পনার ওপর নির্ভর করছে।
এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে সোনার দামের ওঠানামা বা ভোলাটিলিটি অনেক বিনিয়োগকারীকে সতর্ক করে তুলেছে। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মতো বড় বিনিয়োগকারীরা এখন আগের তুলনায় বেশি হিসাব করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
তেলের দাম বাড়লেও সোনা কেন চুপ?
তেলের দাম বেড়ে গেলে সাধারণত মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে। আর মুদ্রাস্ফীতি বাড়লে সোনার দাম বাড়ার কথা।
কিন্তু এবার উল্টো একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তেলের দাম বাড়ার ফলে মুদ্রাস্ফীতির চাপ তৈরি হচ্ছে, আর সেই কারণে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।
এই সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনাই আবার সোনার দাম বাড়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সামনে কী হতে পারে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সোনার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে মূলত দুইটি বিষয়ের ওপর।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়। যদি তারা সুদের হার কমানোর ইঙ্গিত দেয়, তাহলে সোনার দাম আবার বাড়তে পারে।
দ্বিতীয়ত, এই যুদ্ধ কতদিন চলবে।
যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয় এবং আরও বড় আকার ধারণ করে, তাহলে বিনিয়োগকারীরা আবার সোনার দিকে ঝুঁকতে পারেন। তখন সোনার দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করতে পারে।
কিন্তু যদি যুদ্ধ দ্রুত শেষ হয়, তাহলে সোনার দামে বড় কোনো পরিবর্তন নাও দেখা যেতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এবার ইরান যুদ্ধের প্রভাব সোনার বাজারে প্রত্যাশিতভাবে পড়েনি।
ডলারের শক্ত অবস্থান, সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আগে থেকেই উচ্চ দামের কারণে সোনা আপাতত স্থির রয়েছে।
তবে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে পারে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বা অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়লে, সোনা আবারও তার পুরোনো “নিরাপদ আশ্রয়” হিসেবে ফিরে আসতে পারে।
এখন শুধু সময়ই বলে দেবে—সোনা কি আবার জ্বলে উঠবে, নাকি এই স্থিরতাই কিছুদিন চলবে।

