মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানে। ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক হামলা চালিয়েছে, যেখানে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা।
বুধবার, ১৮ মার্চ সকালে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে এই হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তাদের দাবি, এই অভিযান পরিচালনার মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় সচল করা।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত শুরুর পর থেকেই পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠেছে। এই উত্তেজনার জেরে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতেই যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
সেন্টকম জানিয়েছে, ইরানের উপকূল বরাবর অবস্থিত সুরক্ষিত ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোতে ৫ হাজার পাউন্ড ওজনের ডিপ পেনিট্রেটর বা বাঙ্কার বাস্টার বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে।
এই ধরনের বোমা সাধারণত মাটির গভীরে বা শক্তিশালী বাঙ্কারের ভেতরে থাকা লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ, এমন ঘাঁটিগুলো যেগুলো সাধারণ বোমায় ধ্বংস করা কঠিন, সেগুলো ভেঙে ফেলতেই এই অস্ত্র ব্যবহৃত হয়।
মার্কিন বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, এসব ঘাঁটিতে থাকা জাহাজ বিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আন্তর্জাতিক নৌপথের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছিল। তাই এই হামলার মাধ্যমে সেই হুমকি দূর করার চেষ্টা করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই সংকট শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলেছে।
তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে পরিবহন, শিল্প উৎপাদন এবং দৈনন্দিন পণ্যের ওপরও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের মন্দার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে। সেই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এই জলপথ দ্রুত উন্মুক্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
এই অভিযানে সহযোগিতা চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো জোটের দেশগুলোর কাছে আহ্বান জানিয়েছিল। তবে বেশিরভাগ মিত্র দেশই এতে অংশ নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছে।
এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সবসময় মিত্র দেশগুলোর পাশে দাঁড়ালেও সংকটের সময় তারা একইভাবে সহযোগিতা করছে না।
এমনকি মাইনসুইপার জাহাজ পাঠানোর মতো সীমিত সহায়তাও দিতে রাজি হয়নি অনেক দেশ—যা ট্রাম্পের অসন্তোষ আরও বাড়িয়েছে।
ট্রাম্প আবারও দাবি করেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
যদিও ইরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে, বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।
এই দ্বন্দ্বই মূলত বর্তমান সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রকে উৎসাহিত করে আসছিলেন।
তবে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই যুদ্ধের সিদ্ধান্ত তিনি মূলত নিজের ‘অনুভূতি’ ও মূল্যায়নের ভিত্তিতেই নিয়েছেন। এমনকি যুদ্ধ কখন এবং কীভাবে শেষ হবে, সেটিও তার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
এই হামলায় ব্যবহৃত ৫ হাজার পাউন্ডের বাঙ্কার বাস্টার বোমা অত্যন্ত শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে পরিচিত। এগুলো মাটির গভীরে থাকা ঘাঁটি বা পাহাড়ের ভেতরে নির্মিত স্থাপনা ধ্বংস করতে সক্ষম।
প্রতিটি বোমার আনুমানিক মূল্য প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার মার্কিন ডলার। যদিও এগুলো গত বছর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ব্যবহৃত ৩০ হাজার পাউন্ডের বোমার তুলনায় কিছুটা কম শক্তিশালী, তবুও এগুলো অত্যন্ত কার্যকর ও ধ্বংসাত্মক।
সব মিলিয়ে বলা যায়, হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
একদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা, অন্যদিকে আঞ্চলিক উত্তেজনা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের কূটনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপের ওপর। তবে আপাতত স্পষ্ট—এই সংঘাতের প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো বিশ্বই এর ধাক্কা অনুভব করবে।

