মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা যত বাড়ছে, ততই এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে। বিশেষ করে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় বিপাকে পড়েছে তেলনির্ভর দেশগুলো। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে রাশিয়া।
ভারতের পর এবার পাকিস্তানকেও হ্রাসকৃত মূল্যে জ্বালানি তেল বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে মস্কো। পাকিস্তানে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত অ্যালবার্ট খোরেভ এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, ইসলামাবাদ যদি আনুষ্ঠানিকভাবে আগ্রহ দেখায়, তাহলে রাশিয়া কম দামে তেল সরবরাহ করতে প্রস্তুত।
ইসলামাবাদে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে খোরেভ স্পষ্ট করে বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে জ্বালানি খাত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। তার মতে, এই খাতে সহযোগিতা বাড়ানো গেলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।
তিনি আরও জানান, এখন সিদ্ধান্ত পুরোপুরি পাকিস্তানের হাতে। ইসলামাবাদ যদি উদ্যোগ নেয়, তাহলে রাশিয়া তেল সরবরাহে কোনো বাধা দেখবে না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের এই প্রস্তাবের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুট হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের বড় একটি অংশের জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়।
ইরানের আরোপিত অবরোধের ফলে অনেক দেশের মতো পাকিস্তানও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ দেশটি জ্বালানি তেলের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
এই সংকটের কারণে নতুন তেলের চালান আসতে না পারায় দেশের ভেতরে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে পাকিস্তান সরকার ইতোমধ্যেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।
সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়িয়ে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ফলে পরিবহন খরচ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে।
এই অবস্থায় রাশিয়ার প্রস্তাব পাকিস্তানের জন্য একটি সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রুশ রাষ্ট্রদূত খোরেভ জোর দিয়ে বলেছেন, জ্বালানি খাতই দুই দেশের সম্পর্কের মূল ভিত্তি হতে পারে। তিনি মনে করেন, এই খাতে সহযোগিতা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব গড়ে উঠতে পারে।
রাশিয়া ইতোমধ্যেই ভারতের সঙ্গে একই ধরনের চুক্তির মাধ্যমে সস্তায় তেল সরবরাহ করছে। এখন পাকিস্তানও সেই সুযোগ পেতে পারে, যদি তারা আগ্রহ দেখায়।
সংবাদ সম্মেলনে খোরেভ মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ইরানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপ বিশ্বকে হতবাক করেছে।
তার ভাষায়, বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং অপ্রত্যাশিত। এই উত্তেজনা কখন শেষ হবে, বা কীভাবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে—তা এখনই বলা কঠিন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সামনে দুটি পথ খোলা। একদিকে তারা মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা বজায় রাখতে পারে, অন্যদিকে রাশিয়ার মতো বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে পারে।
যদি পাকিস্তান রাশিয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করে, তাহলে তা শুধু জ্বালানি সংকটই কমাবে না, বরং আঞ্চলিক রাজনীতিতেও নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুধু একটি অঞ্চলের সমস্যা নয়, বরং এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। পাকিস্তানের জ্বালানি সংকট তারই একটি বাস্তব উদাহরণ।
এই সংকটের মধ্যেই রাশিয়ার প্রস্তাব নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়—ইসলামাবাদ এই সুযোগ কাজে লাগায় কি না।

