পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী ঘিরে নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান সেখানে নিজেদের প্রভাব বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এর ফলে পশ্চিমা শিপিং কোম্পানিগুলো ঝুঁকির মুখে পড়েছে এবং তেল পরিবহনে নতুন শক্তির সমীকরণ দেখা দিচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা ইরান গত এক দশকে বিকল্প তেল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। দেশটি একটি তথাকথিত ‘ছায়া বহর’ তৈরি করেছে, যেখানে তেলবাহী ট্যাংকারগুলো পশ্চিমা বীমা ও আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে থেকে পরিচালিত হয়। এই নৌবহর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বর্তমানে এই ট্যাংকারগুলোর অনেকগুলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করছে। কিন্তু একই সময়ে পশ্চিমা অনেক শিপিং কোম্পানি সেখানে চলাচল করতে গিয়ে বাড়তি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজগুলোর জন্য বীমা প্রিমিয়ামও অনেক বেড়ে গেছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখের পর থেকে অন্তত ১৭টি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে আন্তর্জাতিক সূত্র জানিয়েছে। এসব হামলায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এই অবস্থার মধ্যেও ইরান তাদের তেল রপ্তানি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সংঘাতের সময়ে দেশটি প্রতিদিন প্রায় ১.০২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বড় একটি অংশ যাচ্ছে চীনের বাজারে। গত বছর ইরানের গড় দৈনিক তেল রপ্তানি ছিল প্রায় ১.৬৯ মিলিয়ন ব্যারেল।
বিশ্লেষকদের মতে, বিকল্প নৌবহর ব্যবস্থার কারণে ইরান এখন তেল পরিবহনে আগের তুলনায় বেশি স্বাধীনতা পাচ্ছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ কিছুটা কম কার্যকর হয়ে পড়ছে। এদিকে দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশও এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ব্যবহার করে তেল পরিবহন চালিয়ে যেতে আগ্রহী। পাকিস্তান, ভারত ও চীন—এই তিন দেশের জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করে তেল পরিবহন অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছে।
সম্প্রতি ‘করাচি’ নামের একটি জাহাজ, যা সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে তেল বহন করছিল, নিরাপদে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে বলে জানা গেছে। এটি পাকিস্তানের সংশ্লিষ্ট একটি বাণিজ্যিক জাহাজ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক সমুদ্রবাণিজ্যের শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাদের মতে, হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে নতুন ধরনের প্রভাব বলয় তৈরি হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

