চার বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যেন থামার কোনো লক্ষণই দেখাচ্ছে না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন এলাকা দখল, পাল্টা হামলা আর পরস্পরবিরোধী দাবির মধ্য দিয়ে সংঘাত আরও জটিল হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতেই রাশিয়া দাবি করেছে, তারা ইউক্রেনের আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রাম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের বাহিনী উত্তরাঞ্চলীয় সুমি প্রদেশের সোপিচ এবং পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্ক প্রদেশের কালেনিকি গ্রাম দখল করেছে। এই ঘোষণা এমন এক সময় এসেছে, যখন যুদ্ধের দীর্ঘ ১ হাজার ২৫০ কিলোমিটার ফ্রন্টলাইনে কোন পক্ষ এগিয়ে আছে তা নিয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেন একে অপরের বিপরীতমুখী দাবি করে আসছে।
টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে রুশ মন্ত্রণালয় জানায়, দোনেৎস্ক অঞ্চলের কালেনিকি জনপদ ‘মুক্ত’ করা হয়েছে এবং সুমি অঞ্চলের সোপিচ গ্রামেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। রাশিয়ার ভাষায়, এটি তাদের সামরিক অগ্রগতির অংশ।
সোপিচ গ্রামটি ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি রুশ সীমান্তের কাছেই অবস্থিত। কয়েক মাস ধরেই এই এলাকায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে রুশ বাহিনী। বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলগুলো দখলে নেওয়া হলে রাশিয়ার জন্য একটি নিরাপদ বাফার জোন তৈরি করা সহজ হবে।
রাশিয়ার শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল ভ্যালেরি গেরাসিমভও এই অগ্রগতির কথা উল্লেখ করেছেন। সোমবার, ১৬ মার্চ তিনি বলেন, রুশ বাহিনী সুমি ও খারকিভ অঞ্চলে একটি ‘বাফার জোন’ বা নিরপেক্ষ অঞ্চল তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তার মতে, এটি ভবিষ্যৎ সামরিক কৌশলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, কালেনিকি গ্রামটির অবস্থানও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি ইউক্রেনের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা সুরক্ষিত শহর স্লোভিয়ানস্কের পূর্ব দিকে অবস্থিত। গেরাসিমভের ভাষায়, রুশ সেনারা এখন সক্রিয়ভাবে স্লোভিয়ানস্কের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
তবে এই দাবির বিপরীতে ইউক্রেনের অবস্থান ভিন্ন। দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ‘সুসপিলনে’ গত সপ্তাহে জানায়, রুশ সেনারা কালেনিকিতে প্রবেশ করেছে এবং সেখান থেকে ১৯ জন বাসিন্দাকে জোরপূর্বক রাশিয়ার ভেতরে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সোমবার এক বক্তব্যে দাবি করেন, তাদের সেনাবাহিনী রাশিয়ার একটি পরিকল্পিত বড় আক্রমণ নস্যাৎ করে দিয়েছে। তিনি বলেন, যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি রাশিয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে না এবং তারা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা বাস্তবায়ন করতে পারছে না।
এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যই প্রমাণ করে, যুদ্ধক্ষেত্রে আসল পরিস্থিতি ঠিক কতটা জটিল। একদিকে রাশিয়া নিজেদের অগ্রগতির কথা বলছে, অন্যদিকে ইউক্রেন দাবি করছে তারা প্রতিরোধে সফল।
এরই মধ্যে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আরও জানায়, মঙ্গলবার দুপুর ১টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইউক্রেনের ৩৫টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। এই ড্রোনগুলোর বেশিরভাগই ধ্বংস করা হয়েছে রাশিয়ার পূর্ব সীমান্তবর্তী ক্রাসনোদর অঞ্চলের আকাশে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, যুদ্ধ এখনো দীর্ঘ পথ বাকি। নতুন এলাকা দখল, পাল্টা হামলা এবং কৌশলগত অবস্থান শক্ত করার প্রতিযোগিতা—সবকিছু মিলিয়ে সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করছে।
এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি এখনো এই যুদ্ধের দিকে নিবদ্ধ। কারণ এই সংঘাত শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপরও।
শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধ কোথায় গিয়ে থামবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে প্রতিটি নতুন অগ্রগতি কিংবা দাবি স্পষ্ট করে দিচ্ছে—সংঘাতের সমাধান এখনো অনেক দূরে।

