মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা কর্মকর্তা ডা. আলী লারিজানির মৃত্যুর পর। এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে গেছে এবং প্রতিশোধ নিতে সরাসরি ইসরাইলকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালাচ্ছে তেহরান।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা ইসরাইলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর, বিশেষ করে তেল আবিবকে লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় সামরিক ও সরকারি স্থাপনাগুলোকে টার্গেট করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এই অভিযানে ইরান ব্যবহার করেছে অত্যাধুনিক ও শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র। খোররামশাহ-৪, কদর, এমাদ এবং খেইবার শেকান—এইসব দীর্ঘপাল্লার অস্ত্র একের পর এক আঘাত হানে ইসরাইলের বিভিন্ন স্থানে। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে তেল আবিবের কাছে অবস্থিত বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ইসরাইলের বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে অন্তত তিনটি বেসরকারি বিমান গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে একটি বিমানে আগুন ধরে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
গত কয়েকদিন ধরেই এই বিমানবন্দরকে ঘিরে হামলার খবর আসছে। বুধবার, ১৮ মার্চ ইরান দাবি করে, তারা সেখানে অবস্থানরত ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর জ্বালানি সরবরাহকারী রিফুয়েলিং জেট লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, তারা অধিকৃত অঞ্চলে থাকা ইসরাইলি বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। বিশেষ করে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে থাকা সামরিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, একঝাঁক ড্রোন ব্যবহার করে এই হামলা চালানো হয়েছে, যা সরাসরি ইসরাইলের সামরিক সক্ষমতার ওপর আঘাত হানার উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
এই হামলার মধ্য দিয়ে ইরান স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছে—তাদের শীর্ষ নেতাদের হত্যার জবাব তারা দেবে এবং তা হবে কঠোর। ইরানি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, শহীদদের রক্তের প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত এই অভিযান থামবে না।
এই সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় বড় ধরনের হামলা চালায়। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, একাধিক সামরিক কমান্ডার এবং বেসামরিক নাগরিক নিহত হন।
এরপর থেকেই পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ইরানের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় একের পর এক বিমান হামলা চালানো হয়, যার ফলে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়।
এর জবাবে ইরানও পাল্টা প্রতিশোধমূলক অভিযান শুরু করে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ঢেউ তুলে তারা ইসরাইলের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে লক্ষ্য করে আঘাত হানতে থাকে।
বর্তমানে এই সংঘাত এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে উভয় পক্ষই সরাসরি একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করছে। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে এবং যেকোনো সময় বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পাল্টাপাল্টি হামলা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রতিশোধ আর পাল্টা প্রতিশোধের এই চক্র কোথায় গিয়ে থামবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—এই সংঘাত এখন আর সীমিত নেই, বরং তা একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিচ্ছে।

