পবিত্র রমজান মাস মুসলিমদের জন্য আত্মশুদ্ধি ও ইবাদতের সময়। কিন্তু এই পবিত্র মাসেই পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত ইসলাম ধর্মের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান আল-আকসা মসজিদ ঘিরে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনীর কড়াকড়ি।
স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে মিডল ইস্ট মনিটর জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাতে জেরুজালেমের বিভিন্ন এলাকায় ফিলিস্তিনিদের তারাবিহ নামাজ আদায়ে বাধা দেয় ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী। বিশেষ করে বাব আল-আমুদ বা দামেস্ক গেট এবং বাব আল-সাহিরা এলাকায় অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়। এসব এলাকায় জড়ো হওয়া মানুষদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয় এবং অনেককেই নামাজ আদায় করতে দেওয়া হয়নি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, শুধু বাধাই নয়, অনেক ক্ষেত্রে মুসল্লিদের জোর করে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিয়ার গ্যাসও নিক্ষেপ করা হয়।
এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং চলমান একটি কঠোর নীতির অংশ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই আল-আকসা মসজিদ এলাকায় প্রবেশে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। ফলে বহু ফিলিস্তিনি মসজিদে প্রবেশ তো দূরের কথা, আশপাশেও নামাজ আদায় করতে পারছেন না। ইশা ও তারাবিহ—উভয় নামাজেই বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলেও তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। এর আগে টানা প্রায় ১২ দিন আল-আকসা মসজিদ বন্ধ রাখার ঘটনায় আটটি মুসলিম দেশ একযোগে নিন্দা জানিয়েছে। কাতার, জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, পাকিস্তান, সৌদি আরব, মিশর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত এই পদক্ষেপকে ‘অবৈধ ও অযৌক্তিক’ বলে উল্লেখ করেছে।
এক যৌথ বিবৃতিতে দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বলেন, জেরুজালেমের পবিত্র স্থানগুলোতে প্রবেশে বাধা দেওয়া আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবাধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন। তারা জোর দিয়ে বলেন, আল-আকসা মসজিদ মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত একটি পবিত্র স্থান এবং এর প্রশাসনিক দায়িত্ব জর্ডানের ওয়াকফ মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা উচিত।
তারা ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যেন দ্রুত আল-আকসা মসজিদের গেট খুলে দেওয়া হয়, পুরনো জেরুজালেম শহরে প্রবেশে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয় এবং মুসলমানদের অবাধে ইবাদত করার সুযোগ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, ইসরায়েল এসব পদক্ষেপকে নিরাপত্তাজনিত ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। তাদের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই কঠোরতা। তবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, এটি তাদের ধর্মীয় অধিকার হরণ করার একটি কৌশল।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন জানা যায়, শবে কদরের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাতেও মুসল্লিদের আল-আকসায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। মিডল ইস্ট মনিটরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানা ১৭ দিন বন্ধ থাকার কারণে রমজানের ২৭তম রাতে শত শত মুসলিমকে মসজিদের বাইরে রাত কাটাতে হয়েছে।
এদিকে, আল-আকসা মসজিদ বন্ধ থাকায় একটি নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনি অঞ্চলের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি এবং আল-আকসার খতিব শেখ ইকরিমা সাবরি একটি ফতোয়া জারি করেছেন। সেখানে মুসলমানদের আহ্বান জানানো হয়েছে, তারা যেন আল-আকসা মসজিদের যতটা সম্ভব কাছাকাছি স্থানে গিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন।
ফিলিস্তিনি সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই ফতোয়ার মাধ্যমে মুসলিমদের এক ধরনের প্রতিবাদমূলক অবস্থান নিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে জেরুজালেমের অন্যান্য মসজিদে ঈদের জামাত না করারও আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে আল-আকসার গুরুত্ব আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা যায়।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল। ধর্মীয় স্বাধীনতা, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সামরিক বাস্তবতার সংঘর্ষে জেরুজালেম আবারও একটি অস্থির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
রমজানের পবিত্র সময়ে এমন পরিস্থিতি মুসলিম বিশ্বের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন প্রশ্ন একটাই—এই উত্তেজনা কোথায় গিয়ে থামবে, আর কবে আবার স্বাভাবিকভাবে আল-আকসার দরজা খুলবে মুসল্লিদের জন্য।

