মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের মধ্যে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড এমন এক তথ্য সামনে এনেছেন, যা শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেই নয়, বরং ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বুধবার, ১৮ মার্চ ওয়াশিংটন ডিসিতে সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির সামনে দেওয়া এক লিখিত সাক্ষ্যে গ্যাবার্ড জানিয়েছেন, মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার পর ইরান তাদের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা পুনর্গঠনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তার এই বক্তব্য অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছে, কারণ এতদিন ধরে ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক হুমকিকেই যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছিল।
গ্যাবার্ড তার সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালের জুনে পরিচালিত ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এর ফলে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি কার্যত ধ্বংস হয়ে যায়। সেই হামলার পর থেকে তেহরান তাদের সেই সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি বলে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন।
এই তথ্য সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানকে। ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছিলেন, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাই এই যুদ্ধের প্রধান কারণ। কিন্তু গ্যাবার্ডের এই মূল্যায়ন বলছে, সেই হুমকি অন্তত এখন আর সক্রিয় নেই।
সিনেট কমিটির শুনানিতে বিষয়টি নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়। দেখা যায়, গ্যাবার্ড তার জনসমক্ষে দেওয়া মৌখিক বক্তব্যে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি উল্লেখ করেননি। বিষয়টি সামনে আনেন ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য মৌখিক বক্তব্যে বাদ দেওয়া হলো।
জবাবে গ্যাবার্ড সময়ের অভাবের কথা উল্লেখ করেন। তবে তিনি এই মূল্যায়ন অস্বীকার করেননি। বরং তার এই ব্যাখ্যা আরও সন্দেহের জন্ম দেয়। ওয়ার্নার সরাসরি অভিযোগ করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় এই অংশটি ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। মাত্র একদিন আগে, মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল কাউন্টারটেররিজম সেন্টারের পরিচালক জো কেন্ট পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগপত্রে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো ‘আসন্ন হুমকি’ ছিল না।
কেন্ট আরও অভিযোগ করেন, ট্রাম্প তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির পরিপন্থী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি নতুন যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেছেন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও একই ধরনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ব্রিটিশ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জোনাথন পাওয়েল আগে থেকেই বলেছিলেন, কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান সম্ভব ছিল। তাদের মতে, যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি না করেও সমস্যার সমাধান করা যেত।
অন্যদিকে, হোয়াইট হাউস দাবি করছে, সামরিক অভিযানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও নৌবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস করা হয়েছে। তবে গ্যাবার্ড এই মূল্যায়নে কিছুটা সংযত অবস্থান নিয়েছেন।
তিনি বলেন, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হলেও দেশটির শাসনব্যবস্থা এখনো টিকে আছে। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, আলী লারিজানি এবং ইসমাইল খতিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মৃত্যুর পরও সরকার পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।
তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, এই পরিস্থিতি স্থায়ী নয়। ইরান এবং তাদের সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো এখনও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে।
গ্যাবার্ডের মতে, যদি বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে থাকে, তাহলে আগামী কয়েক বছরে তারা আবারও নিজেদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা গড়ে তোলার চেষ্টা করবে।
সব মিলিয়ে এই মূল্যায়ন নতুন এক বাস্তবতা সামনে আনছে। একদিকে যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঝুঁকিও অস্বীকার করা যাচ্ছে না।
বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, বরং রাজনৈতিক অঙ্গনেও এই সংঘাতের প্রভাব গভীর হচ্ছে। ওয়াশিংটনের ভেতরের বিভক্ত অবস্থান এবং পরস্পরবিরোধী বক্তব্য প্রমাণ করছে, এই যুদ্ধের প্রভাব এখনো পুরোপুরি বোঝা সম্ভব হয়নি।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়—যে যুদ্ধের ভিত্তি হিসেবে একটি হুমকিকে তুলে ধরা হয়েছিল, সেই হুমকি যদি বাস্তবে সক্রিয় না থাকে, তাহলে এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

