মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত শুধু সামরিক দিক থেকেই নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে। ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে এবার ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট প্রশাসনের এক সিনিয়র কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, এই বিশাল অঙ্কের অর্থ মূলত যুদ্ধের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং অস্ত্রশস্ত্রের ঘাটতি পূরণের জন্য প্রয়োজন। তবে এই প্রস্তাব এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসে পাঠানো হয়নি, আর পাঠানো হলেও তা সহজে অনুমোদন পাবে কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এই প্রস্তাবটি বর্তমান বিমান হামলার ব্যয়কেও ছাড়িয়ে গেছে, যা পরিস্থিতির গুরুত্বই তুলে ধরে। গত তিন সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বাহিনী হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এতে করে বিপুল পরিমাণ নিখুঁত নিশানার গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছে, যা এখন দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। সেই ঘাটতি পূরণ করতেই এই বড় বাজেটের প্রয়োজন বলে মনে করছে পেন্টাগন।
প্রতিরক্ষা দপ্তরের ভেতরে এই পরিকল্পনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডেপুটি ডিফেন্স সেক্রেটারি স্টিভেন ফেইনবার্গ। তিনি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও শক্তিশালী করা এবং অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন। তার লক্ষ্য হলো দ্রুত উৎপাদন বাড়িয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে সরবরাহ নিশ্চিত করা।
তবে বাস্তবতা এতটা সহজ নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অর্থ বরাদ্দ দিলেই উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়। শ্রমিক সংকট, উৎপাদন অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অভাব—সব মিলিয়ে এই প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ।
এই প্রস্তাব কংগ্রেসে গেলে তা নিয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ইরান যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থন তুলনামূলকভাবে সীমিত। ডেমোক্র্যাটরা শুরু থেকেই এই যুদ্ধের সমালোচনা করে আসছেন এবং অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের বিরোধিতা করতে পারেন।
অন্যদিকে রিপাবলিকানদের একটি অংশ অতিরিক্ত অর্থায়নের পক্ষে থাকলেও, সিনেটে ৬০ ভোটের বাধা পেরিয়ে এই প্রস্তাব অনুমোদন পাওয়া সহজ হবে না। ফলে এই অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি এখন একটি বড় রাজনৈতিক লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এখানে একটি বড় রাজনৈতিক দ্বন্দ্বও সামনে এসেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনের সময় বিদেশি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এমনকি ইউক্রেন যুদ্ধের পেছনে কংগ্রেস অনুমোদিত ১৮৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয়েরও তিনি সমালোচনা করেছিলেন।
কিন্তু বাস্তবে ইরান যুদ্ধের খরচ দ্রুত বাড়ছে। কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধ শুরুর প্রথম সপ্তাহেই ব্যয় ১১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এই গতি অব্যাহত থাকলে মোট ব্যয় আরও অনেক বেশি হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে পেন্টাগনের প্রস্তাব একদিকে যেমন সামরিক প্রয়োজনের প্রতিফলন, অন্যদিকে এটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও রাজনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরান যুদ্ধ এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, অর্থনীতি এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
শেষ পর্যন্ত এই প্রস্তাব অনুমোদন পায় কি না, সেটিই নির্ধারণ করবে—যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধ কতটা দীর্ঘ ও কতটা গভীরভাবে চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।

