মিডল ইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণ—
এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ইসরায়েল, ওয়াশিংটন এমনকি লেবানন সরকারও এমনভাবে কথা বলছে, যেন হিজবুল্লাহ চিরতরে ভেঙে পড়েছে।
কিন্তু লেবাননের এই সশস্ত্র আন্দোলনটি আবারো ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে এবং ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের জবাবে শত্রুর ওপর আঘাত হানছে।
রণক্ষেত্রে এর কার্যকলাপ এবং ইসরায়েলি ভূখণ্ডের গভীরে আঘাত হানার ক্ষমতা থেকে বোঝা যায় যে, হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের সঙ্গে তার ১৫ মাসের যুদ্ধবিরতিকে যুদ্ধের সমাপ্তি হিসেবে নয়, বরং পুনর্গঠন, পুনঃসংগঠন এবং পরবর্তীতে যা অবশ্যম্ভাবী বলে তারা বিশ্বাস করত তার জন্য প্রস্তুত হওয়ার একটি সংকীর্ণ ও জরুরি সুযোগ হিসেবে দেখেছিল।
গাজা যুদ্ধের জেরে সৃষ্ট এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের পর, ২৭ নভেম্বর ২০২৪-এ হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে যখন একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, তখন জনসমক্ষে দেওয়া ভাষ্যটি ছিল স্পষ্ট।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, এই অভিযান হিজবুল্লাহকে “কয়েক দশক” পিছিয়ে দিয়েছে, এর বেশিরভাগ রকেট ধ্বংস করেছে এবং এর শীর্ষ নেতৃত্বকে নির্মূল করেছে।
একজন ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তা এটিকে “অত্যন্ত দুর্বল” বলে বর্ণনা করেছেন। সেন্টকম কমান্ডার মাইকেল কুরিলা আরও এক ধাপ এগিয়ে হিজবুল্লাহকে “ধ্বংসপ্রাপ্ত” বলে অভিহিত করেছেন এবং সাবেক দলটির “শক্ত ঘাঁটি” হিসেবে বর্ণনা করা এলাকাগুলোতে লেবাননের সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের প্রশংসা করেছেন।
বৈরুতে রাজনৈতিক ভাষাতেও পরিবর্তন এসেছে। রাষ্ট্রপতি জোসেফ আউন বলেছেন, “অস্ত্র বহনের একচেটিয়া অধিকার” অবশ্যই রাষ্ট্রের হাতে থাকতে হবে এবং প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম বলেছেন, লিতানি নদীর দক্ষিণে হিজবুল্লাহর সামরিক উপস্থিতি প্রায় শেষ হয়ে গেছে।
ভাষ্যকারদের বলতে শোনা যায়, ইসরায়েলি হামলায় দলটির ৮০ শতাংশ সামরিক শক্তি ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রচলিত ধারণা ছিল, হিজবুল্লাহ ভেঙে পড়েছে এবং তাদের নিরস্ত্রীকরণ কেবল সময়ের ব্যাপার।
কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সেই বয়ানে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতিকে কৌশলগত পতন বলে ভুল করা হয়েছিল।
হিজবুল্লাহর যুদ্ধ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত চারটি সূত্র অনুসারে, যুদ্ধবিরতির একদিন পর, অর্থাৎ ২৮ নভেম্বর থেকেই পুনর্গঠন শুরু হয়।
সংগঠনের অভ্যন্তরে এমন ধারণা ছিল না যে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে; বরং ইসরায়েলের সঙ্গে আরেকটি দফা সংঘাত কেবল সময়ের ব্যাপার ছিল।
সেই দৃষ্টিকোণ থেকে, সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কোনো রাজনৈতিক নিষ্পত্তি ছিল না। এটি ছিল একটি অভিযানিক বিরতি, এবং এর প্রতিটি দিনেরই গুরুত্ব ছিল।
|
মিশন সম্পন্ন
সূত্রগুলো জানায়, হিজবুল্লাহ বিশ্বাস করে যে ইসরায়েল দুটি কারণে তাদের হামলা বন্ধ করে দিয়েছে।
প্রথমত, ইসরায়েল মনে করেছিল সংগঠনটি এতটাই কঠিন আঘাত পেয়েছে যে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপ হিজবুল্লাহকে রাজনৈতিকভাবে ও স্থায়ীভাবে ভেঙে ফেলবে।
দ্বিতীয়ত, ইসরায়েল এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যে, যখন তারা বিশ্বাস করে কৌশলগত সাফল্য ইতোমধ্যেই অর্জিত হয়েছে, তখন যুদ্ধ আরও চালিয়ে গেলে নিজেদের আরও ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি বাড়বে।
তবে সূত্রগুলো বলছে, প্রকাশ্য সংঘাতে এই বিরতি হিজবুল্লাহর জন্য একটি সুযোগ ছিল।
এর অর্থ হলো, যদিও যুদ্ধটি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছিল, এটি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও তৈরি করেছিল যেখানে সংগঠনটি নিজেকে পুনর্গঠন করতে পারত।
এবং সূত্রমতে, এর পরবর্তী প্রচেষ্টা কেবল মৌলিক সামরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
লক্ষ্যটি ছিল আরও ব্যাপক: ২০২৩ সালের অক্টোবরের আগের হিজবুল্লাহর সক্ষমতা, কাঠামো এবং অবকাঠামোর যতটা সম্ভব পুনরুদ্ধার করা।
সূত্রগুলো জানায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি নাগাদ সামরিক কমান্ডাররা নেতৃত্বকে জানিয়েছিলেন যে, যা কিছু পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব ছিল, তা সম্পন্ন হয়েছে।
একটি সূত্রের ভাষায়: “আমরা নেতাদের বলেছি—মিশন সম্পন্ন হয়েছে।”
কিছু সক্ষমতা, বিশেষ করে বিমান প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত ব্যবস্থাগুলোর সঙ্গে যুক্ত অংশগুলো, এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যা সহজে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়।
তবে সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পুনর্গঠন প্রচেষ্টা ছিল ব্যাপক, পদ্ধতিগত এবং সুশৃঙ্খল।

‘চলন্ত শহীদ’
হিজবুল্লাহর সামনে কাজটি ছিল বিশাল।
২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর, ইসরায়েল দলীয় সদস্যদের ব্যবহৃত শত শত পেজার বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে বেসামরিক নাগরিকসহ কয়েক ডজন মানুষ আহত হয় এবং গোয়েন্দা অনুপ্রবেশের চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রকাশ পায়।
সেই মাসের শেষের দিকে বৈরুত ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে চালানো বিমান হামলায় দলটির শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের মহাসচিব হাসান নাসরাল্লাহ নিহত হন।
ইসরায়েল একটি বহুস্তরীয় আকস্মিক অভিযান চালায়, যার লক্ষ্য ছিল নেতৃত্ব ভেঙে দেওয়া, নেটওয়ার্ক উন্মোচন করা এবং কার্যক্ষমতা অচল করে দেওয়া।
একটি সূত্র হিজবুল্লাহর নেতৃত্বকে “অন্ধ, ছত্রভঙ্গ ও বিধ্বস্ত” হিসেবে বর্ণনা করেছে।
তবে সীমান্তে জীবনপণ লড়াই চালিয়ে যাওয়া যোদ্ধাদের দৃঢ়তা সংগঠনটিকে পুনর্গঠনের সুযোগ করে দেয়।
“এই চলন্ত শহীদরাই দলটিকে বাঁচিয়েছিল,” সূত্রটি জানায়।
কেন কিছু কমান্ডার বেঁচে গেলেন—এই প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়, “তারা ফোন ধরেননি।”
কাঠামোগত পুনর্বিবেচনা
সূত্রমতে, হিজবুল্লাহর যোগাযোগ ব্যবস্থায় ধারণার চেয়েও গভীরে অনুপ্রবেশ করা হয়েছিল।
এরপর দলটি পূর্বের যোগাযোগ পদ্ধতি প্রায় পরিত্যাগ করে এবং মানব বার্তাবাহক, হাতে লেখা নোটের মতো মৌলিক পদ্ধতিতে ফিরে যায়।
এই পরিবর্তনকে দুর্বলতা নয়, বরং “অভিযোজনমূলক কৌশল” হিসেবে দেখা হয়। একই সঙ্গে সংগঠনটি আবার বিকেন্দ্রীভূত কাঠামোর দিকে ফিরে যায়—যা “মুগনিয়েহ স্পিরিট” নামে পরিচিত। এই মডেলে ছোট, স্বায়ত্তশাসিত ইউনিটগুলো কাজ করে, যা টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়ায়।
দক্ষিণে প্রত্যাবর্তন
প্রকাশ্যে দাবি করা হয়েছিল, লিতানি নদীর দক্ষিণে হিজবুল্লাহর উপস্থিতি থাকবে না। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ছোট ছোট ইউনিট ও ক্যাডারের মাধ্যমে সংগঠনটি নীরবে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন করে।
সূত্রের ভাষায়: “আমরা ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির মাধ্যমে পুনর্গঠন চালিয়ে গেছি।”
পুনঃসরবরাহের চ্যালেঞ্জ
অনেকেই মনে করেছিল সরবরাহ পথ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় হিজবুল্লাহ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। তবে বিশৃঙ্খলার সুযোগে তারা রসদ সরিয়ে ফেলে এবং ইরানের সহায়তায় নতুন মজুদ গড়ে তোলে। যদিও কিছু উন্নত সক্ষমতা পুরোপুরি পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়নি।
আবারো সক্রিয়
সাম্প্রতিক হামলায় দেখা গেছে, হিজবুল্লাহ এখনও সক্রিয়। ২ মার্চ তারা প্রায় ৬০টি রকেট ও ড্রোন ছোড়ে, পরের দিনও একই ধরনের হামলা চালায়। দক্ষিণ ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানায় আশকেলনসহ বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়ায়। যে সংগঠনকে ভেঙে পড়া বলা হচ্ছিল, সেটিই আবারও যুদ্ধক্ষেত্রে সক্রিয়।
একটি সূত্র স্মরণ করিয়ে দেয়: “হিজবুল্লাহ কোনো দল নয়, এটি একটি জাতি—আর জাতি কখনো মরে না।”

