ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক সময় ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছেন, যখন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পর্ক নিজ দেশেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের সম্পর্ককে অটুট ও কৌশলগত বলে মনে করা হলেও সাম্প্রতিক জনমত এবং রাজনৈতিক বিভাজন সেই ধারণাকে নতুন করে নাড়িয়ে দিয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগের দিন প্রকাশিত গ্যালাপের এক জরিপে দেখা যায়, ইসরাইল সম্পর্কে মার্কিন নাগরিকদের ইতিবাচক মনোভাব একবিংশ শতাব্দীর মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো—এই প্রথমবারের মতো মার্কিন জনগণের একটি বড় অংশ ইসরাইলিদের চেয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি সহানুভূতি প্রকাশ করেছে। এই পরিবর্তন শুধু একটি জনমত জরিপের ফল নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে মার্কিন ডানপন্থী রাজনীতির অভ্যন্তরীণ বিভাজন। রক্ষণশীল রাজনীতির একটি অংশ এখন ক্রমেই ইসরাইলকে ঘিরে সমালোচনামুখর হয়ে উঠছে। কিছু প্রভাবশালী কণ্ঠ এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যার জন্য ইসরাইলকে দায়ী করে ষড়যন্ত্রমূলক বক্তব্য দিচ্ছে, যা একসময় কল্পনাতীত ছিল।
এমন এক প্রেক্ষাপটে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ায় জনমতের সন্দেহ আরও বাড়া স্বাভাবিক। অনেকেই এই সংঘাতকে শুধু ভূ-রাজনৈতিক নয়, বরং প্রভাবশালী মিত্রের চাপের ফল হিসেবেও দেখতে শুরু করেছেন। আর এই ধারণাকে শক্তিশালী করেছে খোদ ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু অসংলগ্ন ও বিতর্কিত বক্তব্য।
এর একটি উদাহরণ হলো পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বক্তব্য, যেখানে তিনি দাবি করেন—ইসরাইল যাই ঘটুক না কেন ইরানে হামলা চালাবে এবং সেই প্রেক্ষাপটে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এই যুক্তি অনেকের কাছে এমন মনে হয়েছে, যেন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ইসরাইলের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রশাসন দ্রুতই এই অবস্থান থেকে সরে আসে, যা তাদের নীতিগত দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসে।
আরও বড় বিতর্ক তৈরি হয় ন্যাশনাল কাউন্টার-টেররিজম সেন্টারের পরিচালক জো কেন্টের পদত্যাগকে কেন্দ্র করে। তিনি শুধু পদত্যাগই করেননি, বরং সরাসরি অভিযোগ করেন যে ইসরাইল এবং তার প্রভাবশালী লবি যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেছে। তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যদিও অনেকেই তাকে চরমপন্থী হিসেবে উড়িয়ে দেন।
তবে এখানেই শেষ নয়। ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরাইলি হামলার পর ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র এ সম্পর্কে কিছুই জানত না। এই বক্তব্য সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্নের মুখে পড়ে, কারণ মার্কিন ও ইসরাইলি বিভিন্ন সূত্র ইঙ্গিত দেয় যে হামলাটি সমন্বিত ছিল।
এই দ্বৈত অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংকেত দেয়। একদিকে ট্রাম্প প্রশাসন নিজেদের সরাসরি সম্পৃক্ততা অস্বীকার করতে চায়, অন্যদিকে বাস্তবতা বলছে—দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সামরিক সমন্বয় রয়েছে। এই অস্পষ্টতা শুধু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও বিভ্রান্তি তৈরি করছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই নিজস্ব কৌশল অনুযায়ী এই যুদ্ধ পরিচালনা করছে, নাকি মিত্র দেশের পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে?
এই প্রশ্নটি এখন শুধু বিশ্লেষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং সরকারি পর্যায়েও উঠে এসেছে। পেন্টাগনের ব্রিফিংয়ে এবং কংগ্রেসের শুনানিতে এই বিষয় নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করা হলেও স্পষ্ট কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। এমনকি ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ডও ইসরাইলের কিছু পদক্ষেপের ব্যাখ্যা দিতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন।
এই অনিশ্চয়তা ইঙ্গিত দেয়—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের লক্ষ্য পুরোপুরি এক নয়। যেখানে ইসরাইল বেশি মনোযোগ দিচ্ছে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে দুর্বল করার দিকে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ইরানের সামরিক সক্ষমতা এবং অস্ত্র কর্মসূচিকে নিয়ন্ত্রণে আনা।
এই পার্থক্যই ভবিষ্যতে বড় ধরনের কৌশলগত দ্বন্দ্ব তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধ এখন শুধু একটি সামরিক সংঘাত নয়—এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, জনমত এবং মিত্র সম্পর্কের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের অসংলগ্ন বার্তা এবং তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধ কতটা দীর্ঘ হবে বা কীভাবে শেষ হবে, তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ঐক্য এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কতটা অক্ষুণ্ণ থাকে।
কারণ, এই সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গতিপথও বদলে দিতে পারে

