ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছেন, এই যুদ্ধ সামরিকভাবে ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ‘জয়ী’ হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রশ্নে সহযোগিতা না করায় ন্যাটো মিত্রদের তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি, এমনকি তাদের ‘কাপুরুষ’ বলতেও দ্বিধা করেননি।
শুক্রবার (২০ মার্চ) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধের সামরিক দিকটি মূলত শেষ হয়ে গেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তার লক্ষ্য অর্জন করেছে। তবে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যেসব দেশ তেলের দাম বাড়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে, তারাই আবার হরমুজ প্রণালি সচল করতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী নয়।
ট্রাম্পের ভাষায়, এই প্রণালি খুলে দেওয়া খুবই সহজ একটি সামরিক কাজ এবং এতে ঝুঁকিও তুলনামূলক কম। অথচ মিত্র দেশগুলো এই দায়িত্ব নিতে চাচ্ছে না, যা তার মতে অযৌক্তিক এবং হতাশাজনক। তিনি সরাসরি বলেন, “এটা তাদের জন্য সহজ, ঝুঁকিও কম—কিন্তু তারা করছে না। কাপুরুষ—আমরা এটা মনে রাখব।”
এই বক্তব্য শুধু ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঐতিহ্যগত মিত্রদের সম্পর্কের একটি নতুন বাস্তবতাও তুলে ধরে। ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ন্যাটোর বেশিরভাগ দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ায়নি। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ন্যাটো কার্যত অকার্যকর—একটি ‘কাগুজে বাঘ’ মাত্র।
তিনি আরও দাবি করেন, ন্যাটোর দেশগুলো ইরানকে ‘পারমাণবিক সক্ষম’ হুমকি হিসেবে দেখলেও বাস্তবে সেই হুমকি মোকাবিলায় তারা এগিয়ে আসেনি। ফলে পুরো দায়িত্বই যুক্তরাষ্ট্রকে একাই বহন করতে হচ্ছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প মিত্র দেশগুলোকে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তার বক্তব্যে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আসলে ন্যাটোর সহায়তার প্রয়োজন নেই—এমনকি কখনোই ছিল না।
এই অবস্থান পরিবর্তন বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অনেকেই মনে করছেন, এটি একদিকে মিত্রদের ওপর চাপ তৈরি করার কৌশল, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার একটি উপায়।
কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ইতোমধ্যেই নানা প্রশ্ন ও সমালোচনা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের ‘জয়ের’ দাবি এবং মিত্রদের সমালোচনা এক ধরনের রাজনৈতিক অবস্থানও হতে পারে, যা তার সমর্থকদের কাছে শক্তিশালী নেতৃত্বের বার্তা দেয়।
তবে বাস্তবতা ভিন্ন চিত্রও তুলে ধরছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ, যেখানে যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে অনেক দেশ সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা এড়িয়ে চলছে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের এই বক্তব্য শুধু একটি সামরিক দাবি নয়—এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মিত্র সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা—সবকিছুকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
এখন দেখার বিষয়, যুক্তরাষ্ট্রের এই একক অবস্থান ভবিষ্যতে সংঘাতকে কোন দিকে নিয়ে যায়—আর ন্যাটো জোট এই চাপের মুখে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে কিনা।

