ভারত মহাসাগরের মাঝখানে অবস্থিত দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপকে অনেক দিন ধরেই পশ্চিমা সামরিক কৌশলের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দেখা হয়। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া এবং পূর্ব আফ্রিকাকে নজরে রাখতে এই দ্বীপের অবস্থান এমন যে, একে ঘিরে সামরিক পরিকল্পনা বহু বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে এসেছে। এবার সেই দিয়েগো গার্সিয়াকেই লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান—এমন খবর সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও সিএনএন জানিয়েছে, গত শুক্রবার রাতে এই হামলা চালানো হয়। ইরান থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দ্বীপে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ঠিক কতটা নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে, তা এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে যুক্তরাজ্য বলছে, হামলাটি সফল হয়নি। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের একটিও লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি—একটি মাঝ আকাশেই বিকল হয়ে পড়ে এবং অন্যটি ধ্বংস করা হয়।
কিন্তু এই হামলার তাৎপর্য কেবল ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভেদ করেছে কি না, সেখানে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর বড় গুরুত্ব লুকিয়ে আছে ইরান কী বার্তা দিতে চাইছে, পশ্চিমা দেশগুলো কীভাবে তা নিচ্ছে, আর এই ঘটনার ফলে চলমান যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নিতে পারে—সেখানে।
দিয়েগো গার্সিয়া কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
দিয়েগো গার্সিয়া কেবল একটি দ্বীপ নয়, এটি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক উপস্থিতির প্রতীক। দীর্ঘদিন ধরেই এই ঘাঁটি থেকে পশ্চিমা সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে শুরু করে ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ—সবখানেই এই ঘাঁটির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে সেখানে প্রায় আড়াই হাজার সামরিক সদস্য অবস্থান করছেন, যাদের অধিকাংশই মার্কিন।
গত বছর ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করে বিমান হামলার সময়ও যুক্তরাষ্ট্র এই ঘাঁটি ব্যবহার করেছিল। তখন এখান থেকেই পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম ‘বি-২ স্পিরিট’ বোমারু বিমান মোতায়েন করা হয়। ফলে বোঝাই যায়, দিয়েগো গার্সিয়া কেবল একটি সামরিক ঘাঁটি নয়; এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখান থেকে বিশাল পরিসরের কৌশলগত অভিযান চালানো সম্ভব।
এই কারণেই ইরানের হামলাটি প্রতীকী হলেও তার গুরুত্ব অনেক। কারণ, তেহরান যেন বুঝিয়ে দিল—মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে অবস্থিত ঘাঁটিগুলোও এখন তাদের বিবেচনার বাইরে নয়।
যুক্তরাজ্যের প্রতিক্রিয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ
এ হামলার পর যুক্তরাজ্য এটিকে ‘ইরানের বেপরোয়া আক্রমণ’ বলে নিন্দা জানিয়েছে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ইরানের এই হামলা এবং হরমুজ প্রণালীকে জিম্মি করার প্রচেষ্টা শুধু ব্রিটিশ স্বার্থের জন্য নয়, তাদের মিত্রদের জন্যও বড় হুমকি।
এই ভাষা কূটনৈতিকভাবে যথেষ্ট কড়া। কারণ, লন্ডন শুরুতে ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিজেদের ঘাঁটি ব্যবহারের বিষয়ে অনাগ্রহী ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি বদলাতে থাকে যখন ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা শুরু করে। পরে যুক্তরাজ্য দিয়েগো গার্সিয়া ও আরেকটি ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কেন্দ্রে হামলা চালানোর ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে সম্মত হয়।
অর্থাৎ, এই পুরো প্রক্রিয়ায় ব্রিটেন ধীরে ধীরে আরও সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে। ফলে ইরানের হামলা শুধু সামরিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং লন্ডনের অবস্থান বদলেরও জবাব।
স্টারমার সরকারের ওপর ঘরোয়া চাপ
হামলার সামরিক দিকের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের ভেতরেও এর রাজনৈতিক অভিঘাত তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার শুরুতে এই হামলার খবর প্রকাশ না করায় সমালোচনার মুখে পড়েছেন। বিরোধী কনজারভেটিভ নেত্রী কেমি ব্যাডেনখ প্রশ্ন তুলেছেন, জনগণকে আগে কেন জানানো হয়নি। তিনি এ ঘটনাকে ‘মাদার অব অল ইউ-টার্ন’ বলে উল্লেখ করেছেন।
এতে বোঝা যাচ্ছে, বিষয়টি শুধু পররাষ্ট্রনীতি বা সামরিক কৌশলের প্রশ্নে আটকে নেই; এটি ব্রিটিশ রাজনীতিতেও বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে স্টারমার সরকার এতদিন যে অবস্থান এড়িয়ে চলছিল—অর্থাৎ সরাসরি যুদ্ধ-সম্পৃক্ততার ছাপ—এই হামলার পর সেটি আর পুরোপুরি আড়াল করা সম্ভব হচ্ছে না।
ইরান কি নতুন সামরিক সক্ষমতা দেখাল?
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে আরেকটি বিষয়—ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা। এতদিন পর্যন্ত ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইলের সর্বোচ্চ পাল্লা ২ হাজার কিলোমিটারের মধ্যে বলে ধারণা করা হতো। কিন্তু দিয়েগো গার্সিয়া তো সেই সীমার বহু বাইরে। তাহলে ইরান কীভাবে সেখানে আঘাত হানার চেষ্টা করল?
ইসরায়েলের আলমা রিসার্চ সেন্টার ধারণা করছে, এ হামলায় ইরান আরও উন্নত বা পরিবর্তিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ইরান তাদের মহাকাশ গবেষণা কর্মসূচির আড়ালে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জাস্টিন ব্রঙ্কের মতে, এই হামলায় সম্ভবত ইরান ‘সিমোর্গ’ রকেট ব্যবহার করেছে, যা সাধারণত মহাকাশযান উৎক্ষেপণের কাজে ব্যবহৃত হলেও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবেও কাজ করতে পারে। অন্যদিকে, টম কারাকো বলেছেন, ইরান গত কয়েক বছর ধরে বিশাল ও শক্তিশালী সলিড-ফুয়েল মিসাইল পরীক্ষা করে আসছে। তাই দিয়েগো গার্সিয়ার ঘটনা যতটা চমকপ্রদ মনে হচ্ছে, সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশের কাছে তা পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত নয়।
এখানে মূল বিষয় হলো—ইরান হয়তো তাদের এমন কিছু সক্ষমতা দেখিয়েছে, যেগুলো নিয়ে এতদিন সন্দেহ ছিল, কিন্তু প্রকাশ্যে প্রমাণ ছিল না। এই হামলার মাধ্যমে তারা হয়তো সেই “লুকিয়ে রাখা সামর্থ্য”র একটি ইঙ্গিত দিল।
এটি কি কেবল প্রতিশোধ, নাকি কৌশলগত বার্তা?
এই হামলাকে শুধুই পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর ৭ দিন আগে ইসরায়েলি বাহিনী তেহরানে ইরানের প্রধান মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছিল। ইসরায়েলের আশঙ্কা ছিল, ইরান মহাকাশ থেকে স্যাটেলাইট ধ্বংস করার সক্ষমতা গড়ে তুলছে। সেই প্রেক্ষাপটে দিয়েগো গার্সিয়ার ওপর হামলার চেষ্টা আসলে একটি সুস্পষ্ট কৌশলগত বার্তা হতে পারে।
তেহরান যেন বলতে চাইছে—আপনারা যদি আমাদের সামরিক ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো লক্ষ্য করেন, তাহলে আমরাও আপনাদের বহু দূরের ঘাঁটিকে নিরাপদ থাকতে দেব না।
আর এই বার্তা শুধু ওয়াশিংটন বা লন্ডনের জন্য নয়; এটি পুরো পশ্চিমা জোটের জন্য। কারণ, এতদিন অনেকেই ধরে নিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের ঘাঁটিগুলো তুলনামূলক নিরাপদ। এখন সেই ধারণাই প্রশ্নের মুখে।
‘বিশেষ সম্পর্ক’-এ চাপ
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার ‘বিশেষ সম্পর্ক’ নিয়ে বহু বছর ধরেই কূটনৈতিক পরিসরে আলোচনা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সেই সম্পর্কও কিছুটা চাপের মুখে পড়েছে। কারণ, দিয়েগো গার্সিয়া নিয়ে যুক্তরাজ্যের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে মরিশাসের সঙ্গে করা চুক্তি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি সেই চুক্তিকে ‘চরম বোকামি’ বলে মন্তব্য করেছেন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্রিটিশ সরকারের প্রাথমিক অনীহা এবং পরে অবস্থান বদল। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য সম্পর্ক পুরোপুরি ভাঙনের মুখে না পড়লেও স্পষ্টতই চাপের মধ্যে আছে। এই হামলা সেই চাপ আরও দৃশ্যমান করেছে।
দিয়েগো গার্সিয়ার ইতিহাসও কেন আলোচনায়
এই দ্বীপটি শুধু সামরিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ নয়; এর ইতিহাসও বিতর্কে ভরা। দিয়েগো গার্সিয়া চাগোস দ্বীপপুঞ্জের অংশ, যা ৬০টির বেশি দ্বীপ নিয়ে গঠিত। ১৮১৪ সাল থেকে এটি ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে সেখানে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের জন্য প্রায় ২ হাজার স্থানীয় বাসিন্দাকে উচ্ছেদ করা হয়।
পরে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আদালত এই দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব মরিশাসকে ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানায়। দীর্ঘ আলোচনার পর গত বছর যুক্তরাজ্য মরিশাসের সঙ্গে একটি চুক্তি করে, যার বিনিময়ে অন্তত ৯৯ বছরের জন্য দিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটিটি লিজ পাবে ব্রিটেন। অর্থাৎ, এই দ্বীপ এমনিতেই আন্তর্জাতিক বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল। এখন সামরিক হামলার কারণে এর গুরুত্ব আরও বেড়ে গেল।
হামলার পর কী বদলাতে পারে
বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার পর পশ্চিমা দেশগুলো তাদের দূরবর্তী সামরিক ঘাঁটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যাপারে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হবে। ইতোমধ্যে ঘাঁটি রক্ষায় বৃহত্তর প্রতিরক্ষা প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ব্রিটিশ সরকার ‘এইচএমএস ড্রাগন’ ডেস্ট্রয়ার পাঠিয়েছে। এটি দেখাচ্ছে, লন্ডন বিষয়টিকে হালকাভাবে নিচ্ছে না।
অন্যদিকে, হামলার পর যুক্তরাজ্য বাধ্য হয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের ওপর পাল্টা আক্রমণের অনুমতি দিয়েছে—যে সিদ্ধান্ত এতদিন স্টারমার সরকার এড়িয়ে চলছিল। এর অর্থ, এই হামলা কৌশলগত হিসাবকে শুধু বদলে দেয়নি; বরং পশ্চিমা জোটকে আরও সরাসরি সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রভাব কোথায়
এই ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রভাব সম্ভবত মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত। কারণ, যদি ইরান সত্যিই এমন দূরত্বে আঘাত হানার চেষ্টা করতে সক্ষম হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক যুদ্ধের ধারণা বদলে যাবে। যুদ্ধের সীমানা আর আঞ্চলিক থাকবে না; তা বিস্তৃত হয়ে ভারত মহাসাগর, আফ্রিকা সংলগ্ন রুট এবং বৈশ্বিক সামরিক অবকাঠামোর দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সাবেক ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল স্যার রিচার্ড ব্যারনসের মন্তব্যও এই দিকেই ইঙ্গিত করে। তিনি বলেছেন, ইরানের শক্তিকে বরাবরই ছোট করে দেখা হয়েছে, এবং এই ক্ষেত্রে তাদের ক্ষমতাকে ধারাবাহিকভাবে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। তার মতে, ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় যুক্তরাজ্যের সংশ্লিষ্টতা দেখে থাকে, তাহলে পাল্টা জবাব দেবে—এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
দিয়েগো গার্সিয়ায় ইরানের হামলা সফল হোক বা না হোক, ঘটনাটি পশ্চিমা বিশ্বকে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তা হলো—যুদ্ধের ভৌগোলিক সীমা দ্রুত বদলাচ্ছে, আর যেসব ঘাঁটিকে এতদিন নিরাপদ দূরত্বে মনে করা হতো, সেগুলোও এখন ঝুঁকির বাইরে নয়।
এই হামলা একদিকে যেমন ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে, তেমনি যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রস্তুতি, রাজনৈতিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ যুদ্ধ-পরিকল্পনা নিয়েও বড় বিতর্ক তৈরি করেছে। সবচেয়ে বড় কথা, এটি এমন একটি বার্তা দিয়েছে যা শুধু একটি ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—বরং পুরো যুদ্ধের চরিত্র পাল্টে যাওয়ার সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে।

