মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে সামরিক সংঘাত যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি অদৃশ্য শক্তি—জ্বালানি। সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। এই যুদ্ধের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে, যা প্রথমে ছোট খবর মনে হলেও এর প্রভাব অনেক গভীর—ইসরাইলি গ্যাসের ওপর আরব দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই খবর আসে, জর্ডান ও মিশর সিরিয়ায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। প্রথম নজরে এটি একটি সাধারণ কূটনৈতিক বা সামরিক প্রতিক্রিয়া বলে মনে হতে পারে। কিন্তু গভীরে গেলে বোঝা যায়, এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে একটি বড় বাস্তবতা—এই দেশগুলো নিজেরাই গ্যাসের জন্য ইসরাইলের ওপর নির্ভরশীল।
মিশর নিজেকে গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে পরিচয় দিলেও বাস্তবতা ভিন্ন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের উৎপাদন কমে গেছে। ২০২৪ সালে মিশরের গ্যাস উৎপাদন নেমে আসে ৪৯.৩ বিলিয়ন ঘনমিটারে—যা ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে তাদের আমদানি বেড়ে দাঁড়ায় ১৪.৬ বিলিয়ন ঘনমিটারে, যার মধ্যে প্রায় ১০ বিলিয়ন ঘনমিটারই এসেছে ইসরাইল থেকে।
অন্যদিকে, জর্ডানের অবস্থা আরও স্পষ্ট। দেশটির নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন তাদের চাহিদার ৫ শতাংশেরও কম। বাকিটা পুরোপুরি আমদানি করতে হয়—এবং তার বড় অংশই আসে ইসরাইল থেকে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠে—যখন এই দেশগুলো সিরিয়ায় গ্যাস সরবরাহ করে, তখন সেই গ্যাস আসলে কার?
কাগজে-কলমে সেটি মিশর বা জর্ডানের হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এর একটি বড় অংশই ইসরাইলি উৎস থেকে আসছে—সরাসরি বা পরোক্ষভাবে।
একসময় আরব ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত ‘আরব গ্যাস পাইপলাইন’ এখন কার্যত ইসরাইলি গ্যাস পরিবহনের প্রধান পথ হয়ে উঠেছে।
ইসরাইলের লেভিয়াথান গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্তোলিত গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে জর্ডান হয়ে মিশরে প্রবাহিত হয়। এরপর এই গ্যাস একই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই নেটওয়ার্কে একবার গ্যাস ঢুকে গেলে সেটি আলাদা করে চিহ্নিত করা যায় না। বিভিন্ন উৎসের গ্যাস একসঙ্গে মিশে একটি “কমন সাপ্লাই” তৈরি করে। ফলে মিশর বা জর্ডান যে গ্যাস অন্য দেশে সরবরাহ করছে, তা বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে ইসরাইলি গ্যাসেরই অংশ।
এই নির্ভরতার বাস্তব চিত্র আরও পরিষ্কার হয় যখন ইসরাইল তাদের গ্যাস উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। লেভিয়াথান গ্যাসক্ষেত্র বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জর্ডান ও মিশরে সরবরাহ থেমে যায়, এবং তারা তৎক্ষণাৎ সংকটে পড়ে।
এই ঘটনাটি একবার নয়—এক বছরের মধ্যে দুইবার ঘটেছে। প্রতিবারই দেখা গেছে, ইসরাইলি গ্যাস বন্ধ হওয়া মানেই পুরো আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক অচল হয়ে পড়া।
ফলে বোঝা যায়, এই অঞ্চলের জ্বালানি ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন ইসরাইল অবস্থান করছে।
এই পরিস্থিতি ইসরাইলকে শুধু অর্থনৈতিক সুবিধাই দেয় না, বরং রাজনৈতিক প্রভাবও বাড়ায়। গ্যাস সরবরাহ এখন একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
ইসরাইল ইতোমধ্যে বিভিন্ন সময়ে গ্যাস চুক্তি পুনর্বিবেচনার হুমকি দিয়েছে। এমনকি গাজায় চলমান সংঘাতের সময় বিদ্যুৎ, পানি ও জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও দেখিয়েছে—এই অবকাঠামোকে কীভাবে রাজনৈতিক চাপ হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—এই নির্ভরতা ধীরে ধীরে একটি “ফাঁদে” পরিণত হচ্ছে। সিরিয়া ও লেবাননের মতো দেশগুলো বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছে। তাদের জন্য দ্রুত সমাধান হিসেবে এই আঞ্চলিক গ্যাস নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়া আকর্ষণীয় মনে হতে পারে।
কিন্তু একবার এই নেটওয়ার্কে ঢুকে পড়লে বের হওয়া কঠিন। কারণ এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়—দৈনন্দিন জীবনের মৌলিক চাহিদার সঙ্গে জড়িত: বিদ্যুৎ, পানি, জ্বালানি।
ফলে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা চলে যায় সেই দেশের হাতে, যেটি এই নেটওয়ার্কের কেন্দ্র—এক্ষেত্রে ইসরাইল।
তবে বিকল্প একেবারেই নেই, তা নয়। সিরিয়া ও লেবাননের নিজস্ব গ্যাস মজুদ রয়েছে। সিরিয়ার স্থলভাগে প্রায় ২৮০ বিলিয়ন ঘনমিটার এবং সমুদ্রে আরও বড় মজুদ থাকতে পারে। লেবাননের ক্ষেত্রেও সম্ভাব্য মজুদ বিশাল।
কিন্তু এই সম্পদ কাজে লাগাতে দরকার সময়, অর্থ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চাপও একটি বড় বাধা—বিশেষ করে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব।
সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধ শুধু সামরিক সংঘাত নয়—এটি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রাজনীতির এক নতুন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। ইসরাইল এখন শুধু সামরিক শক্তি নয়, বরং জ্বালানি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পুরো অঞ্চলের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে।
এই প্রভাব আপাতদৃষ্টিতে অদৃশ্য হলেও, এর পরিণতি দীর্ঘমেয়াদি এবং গভীর। কারণ একবার যদি একটি দেশ তার বিদ্যুৎ ও জ্বালানির জন্য অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সেই নির্ভরতা শুধু অর্থনৈতিক থাকে না—এটি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণেও রূপ নিতে পারে।
প্রশ্ন এখন একটাই—আরব দেশগুলো কি এই নির্ভরতার পথ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে, নাকি ধীরে ধীরে একটি অদৃশ্য জালের মধ্যে আটকে পড়বে?

