দেশজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় আবারও এক মর্মান্তিক দিন কাটল। একদিনেই বিভিন্ন জেলায় পৃথক দুর্ঘটনায় অন্তত ২৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে কুমিল্লায়, যেখানে যাত্রীবাহী বাসে ট্রেনের ধাক্কায় একসঙ্গে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এছাড়া ফেনীতে বাস, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের ত্রিমুখী সংঘর্ষে তিনজন, হবিগঞ্জে বাস ও পিকআপ ভ্যানের সংঘর্ষে চারজন, নাটোর, সুনামগঞ্জ ও কুড়িগ্রামে একজন করে এবং কিশোরগঞ্জে দুই বন্ধু নিহত হয়েছেন।
কুমিল্লা: ট্রেন-বাস সংঘর্ষে ১২ প্রাণহানি
সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাটি ঘটে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে। শনিবার (২১ মার্চ) দিবাগত রাত ৩টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী একটি মেইল ট্রেন যাত্রীবাহী ‘মামুন পরিবহন’ বাসটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। সংঘর্ষের পর ট্রেনটি বাসটিকে প্রায় আধা কিলোমিটার পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়।
এ ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকেই কয়েকজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়, পরে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ জনে। নিহতদের মধ্যে পুরুষ, নারী ও শিশুও রয়েছে।
দুর্ঘটনার পর চট্টগ্রামের সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরে আখাউড়া থেকে রিলিফ ট্রেন এসে উদ্ধার কার্যক্রমে অংশ নেয়। ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র্যাব যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান চালায়।
সকাল ৮টার দিকে রেল চলাচল স্বাভাবিক হয়। এ ঘটনায় দুই গেটম্যানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং কারণ অনুসন্ধানে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। নিহতদের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন।
হবিগঞ্জ: বাস-পিকআপ সংঘর্ষে নিহত ৪
হবিগঞ্জের মাধবপুরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আন্দিউড়া এলাকায় বাস ও পিকআপ ভ্যানের সংঘর্ষে চারজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও একজন নারী রয়েছেন। দুর্ঘটনার পর পিকআপটি পাশের পুকুরে পড়ে যায়।
ফেনী: ত্রিমুখী সংঘর্ষে প্রাণ গেল ৩ জনের
ফেনীর রামপুর এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বাস, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ ঘটে। এতে তিনজন নিহত এবং পাঁচজন আহত হন।
প্রাথমিকভাবে জানা যায়, একটি অ্যাম্বুলেন্স ধীরগতিতে যাওয়ার সময় পেছন থেকে বাস ধাক্কা দেয়। পরে সৃষ্ট যানজটে আরেকটি দ্রুতগামী বাস এসে ধাক্কা দিলে বড় দুর্ঘটনা ঘটে।
কুষ্টিয়া: মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় স্কুলছাত্র নিহত
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা লেগে নয়ন শেখ (১৬) নামে এক স্কুলছাত্র নিহত হয়। বন্ধুরা তাকে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
নাটোর: বিয়ের আগের দিনই ঝরল প্রাণ
নাটোরে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। বিয়ের মাত্র একদিন আগে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান প্রকৌশলী জুলফিকার আলী (৩০)। নিজের বিয়ের আয়োজনের কাজে বের হয়ে তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের পেছনে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই মারা যান। আনন্দের ঘর মুহূর্তেই শোকে পরিণত হয়।
কিশোরগঞ্জ: পিকআপের চাপায় দুই বন্ধুর মৃত্যু
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে মোটরসাইকেলে থাকা দুই বন্ধু বিজয় ও জাবির পিকআপ ভ্যানের চাপায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন। আহত আরেকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জ: গাছে ধাক্কা, নিহত যুবক
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে সাফিকুল ইসলাম (২৮) নামে এক যুবক নিহত হন। তার সঙ্গে থাকা দুইজন আহত হন, যার একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
কুড়িগ্রাম: শিশুর মৃত্যু, আহত বাবা-মা
কুড়িগ্রামে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার সংঘর্ষে সাউদা খাতুন (১১) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় তার বাবা-মা গুরুতর আহত হয়েছেন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে শিশুটির মৃত্যু হয়।
একদিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এতগুলো প্রাণহানি আবারও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বেপরোয়া গতি, অব্যবস্থাপনা এবং অসচেতনতা—সব মিলিয়ে সড়কগুলো যেন দিন দিন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
প্রতিটি দুর্ঘটনার পেছনে আলাদা কারণ থাকলেও, একটাই বাস্তবতা স্পষ্ট—সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে এমন মর্মান্তিক ঘটনা বারবারই ফিরে আসবে।

