ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে—এই যুদ্ধের শেষ কোথায়? ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাত যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে পরিস্থিতি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি জটিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট শুরুতে এই অভিযানকে দ্রুত সফল করার আত্মবিশ্বাস দেখালেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক ডোনাল্ড ট্রাম্প সময়ে তিনি ইরানে সামরিক তৎপরতা ‘ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার’ কথা বললেও, বাস্তবে তার ঘোষিত অনেক লক্ষ্য এখনো অর্জিত হয়নি।
s-এর এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—এই যুদ্ধ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন কিছু বাস্তবতার মুখোমুখি, যা শুরুতে তারা অনুমান করতে পারেনি।
লক্ষ্য বদলাচ্ছে, বাড়ছে বিভ্রান্তি
যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, নৌবাহিনী এবং সামরিক শক্তি ধ্বংস করাই তাদের মূল লক্ষ্য। একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছিলেন, যুদ্ধবিরতির কোনো ইচ্ছা নেই।
কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তার বক্তব্যে পরিবর্তন আসে। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে লক্ষ্য অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে এবং এখন সামরিক কার্যক্রম কমানোর কথা ভাবা হচ্ছে।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে—তাহলে আসল লক্ষ্য কী?
শুরুর দিকে যেসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল, যেমন ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে পরাজিত করা—সেগুলো এখন আর তার বক্তব্যে তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। এমনকি ইরানের জনগণের উদ্দেশে আগের মতো কোনো আহ্বানও দেখা যাচ্ছে না।
পারমাণবিক ইস্যুতেও অবস্থান বদলেছে। আগে ট্রাম্প ইরানকে সব পারমাণবিক উপাদান সরিয়ে নিতে বলেছিলেন। এখন তিনি বলছেন, ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক সক্ষমতার কাছাকাছি যেতে না পারে—এটাই মূল লক্ষ্য।
মিত্রদের ওপর বাড়ছে চাপ
যুদ্ধের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর মতামতকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি ট্রাম্প। এমনকি সামরিক অভিযান শুরুর সময়ও তাদের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা হয়নি।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্য দেশগুলোর ওপর দায়িত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
এই প্রসঙ্গে রিচার্ড এন হাস মন্তব্য করেন, “এটিকে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য ট্রাম্পের নতুন নীতি হিসেবে ভাবা যেতে পারে—আমরা পরিস্থিতি তৈরি করেছি, এখন এর দায় অন্যদের নিতে হবে।”
প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধের শুরুতেই ট্রাম্প আশা করেছিলেন—ইরান দ্রুত আত্মসমর্পণ করবে। ৬ মার্চ তার ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি সেই প্রত্যাশারই প্রতিফলন।
কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
ইরানের অভ্যন্তরীণ কাঠামো, শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং প্রবল জাতীয়তাবোধের কারণে দেশটি সহজে ভেঙে পড়েনি। ইউরোপীয় এক কূটনীতিকের ভাষায়, ইরানের মতো একটি দেশে দ্রুত পতন আশা করা বাস্তবসম্মত ছিল না।
এমনকি যুদ্ধের প্রথম দিকে শীর্ষ নেতৃত্বে আঘাত হানলেও সরকারব্যবস্থা ভেঙে পড়বে—এই ধারণাও ভুল প্রমাণিত হয়েছে। দেশের ভেতরে বড় ধরনের বিদ্রোহও দেখা যায়নি।
নতুন চ্যালেঞ্জ: জ্বালানি, মিত্র ও বাস্তবতা
এই যুদ্ধ এখন ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
প্রথমত, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনার কারণে তেলের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে এবং দাম বাড়ছে।
দ্বিতীয়ত, মিত্রদের প্রয়োজনীয়তা। হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ রুটে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কঠিন।
তৃতীয়ত, ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা। সরকারবিরোধী বড় কোনো বিদ্রোহ না হওয়ায় যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনাও কমে গেছে।
সহজ যুদ্ধ নয় ইরান
৯ কোটিরও বেশি মানুষের দেশ ইরান, যার রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস ও শক্তিশালী রাষ্ট্র কাঠামো। ফলে এটিকে দ্রুত দুর্বল করা সহজ নয়—এমনটাই মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।
ট্রাম্প এই অভিযানকে স্বল্পমেয়াদি হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। সময় যত যাচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—এই যুদ্ধের শেষ কোথায়, তা এখনো অনিশ্চিত।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্প প্রশাসনের বারবার লক্ষ্য পরিবর্তন ও কৌশলগত দ্বিধা এই যুদ্ধ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
তিনি কি সত্যিই কৌশলগত পরিবর্তন আনছেন, নাকি ধীরে ধীরে যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—ইরান যুদ্ধ আর সহজ কোনো সমীকরণ নয়, বরং এটি ধীরে ধীরে একটি দীর্ঘমেয়াদি জটিল সংঘাতে পরিণত হচ্ছে।

