ইরানের সামরিক কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা আলি আবদোল্লাহি। তিনি জানিয়েছেন, এতদিন প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকা ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এখন আক্রমণাত্মক কৌশলে এগোচ্ছে।
শনিবার দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, এই পরিবর্তন এখন সম্পূর্ণ হয়েছে এবং নতুন কৌশল অনুযায়ী বাহিনীর কার্যক্রম সাজানো হয়েছে। তার ভাষায়, ভবিষ্যতে শত্রুপক্ষের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই তা নস্যাৎ করতে আধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করা হবে।
খাতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর-এর অধিনায়ক হিসেবে তিনি জানান, তরুণ ইরানি বিজ্ঞানীদের তৈরি উন্নত অস্ত্র ইতোমধ্যেই যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে। সামনে আরও নতুন প্রযুক্তি যুক্ত হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, জাতীয় ঐক্য ও জনগণের সমর্থনই ইরানের আসল শক্তি। এই ঐক্যই যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নিশ্চিত করতে পারে।
ইরানের এই সামরিক সদর দপ্তরটি দেশটির নিয়মিত সেনাবাহিনী ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সব যৌথ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। মূলত এটিই সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ সমন্বয়কারী কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং চলতি বছরের শুরুতে সরাসরি সংঘাতের অভিজ্ঞতা থেকেই ইরান তাদের সামরিক নীতিতে এই পরিবর্তন এনেছে। আগে দেশটি মূলত অসম যুদ্ধকৌশল ও প্রতিরোধভিত্তিক নীতির ওপর নির্ভর করত। কিন্তু এখন তারা ‘অগ্রবর্তী প্রতিরক্ষা’ ধারণার মাধ্যমে সীমান্তের বাইরেও কার্যক্রম বিস্তৃত করছে।
বর্তমানে ইরানের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। সংঘাত শুরুর আগে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজারের মধ্যে, যার পাল্লা প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত।
চলমান সংঘাতে ইরান ইতোমধ্যে ৫০০টির বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২ হাজারের বেশি ড্রোন ব্যবহার করেছে। প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় ধরে আঘাত হানার এই সক্ষমতা বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
ড্রোন উৎপাদনেও ইরান উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে। দেশটি প্রতি মাসে প্রায় ১০ হাজার ড্রোন তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হয়, যা দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানে বড় সুবিধা দিচ্ছে।
দেশীয় প্রযুক্তির উন্নয়ন এই সামরিক শক্তির বড় ভিত্তি। তরুণ বিজ্ঞানীদের তৈরি অতিধ্বনিগত গতির ‘ফাত্তাহ’ ক্ষেপণাস্ত্র এর একটি উদাহরণ, যা অত্যন্ত দ্রুতগতির হওয়ায় প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
সামরিক খাতেও ব্যয় বাড়াচ্ছে ইরান। ২০২৪ সালে দেশটি প্রায় ৭ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, যা আগামী বছরে বাড়িয়ে প্রায় ৯ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই নতুন কৌশল মূলত প্রতিরোধ ও বিঘ্ন সৃষ্টির মিশ্রণ। এতে বড় আকারের প্রচলিত যুদ্ধ ছাড়াই প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব।
একই সঙ্গে অতীতের সংঘাত, বিশেষ করে ইরান-ইরাক যুদ্ধ এবং পরবর্তী বিভিন্ন প্রক্সি সংঘাতের অভিজ্ঞতাও এই নতুন কৌশল গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এখন বিকেন্দ্রীকৃত কমান্ড কাঠামোও এই কৌশলের অংশ হয়ে উঠছে।
এই পরিবর্তনের ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর নজরও এখন এই পরিবর্তনের দিকে।
সব মিলিয়ে, ইরান নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও স্বনির্ভরতার ওপর ভর করে একটি নতুন সামরিক পথচলা শুরু করেছে। প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে সরে এসে আগাম আঘাতের কৌশলে ঝুঁকে পড়া—এটি ভবিষ্যতের সংঘাতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

