ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতে মাত্র ২১ দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বড় ধরনের সামরিক ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। একদিকে উন্নত যুদ্ধবিমান ও নজরদারি ড্রোন, অন্যদিকে ব্যয়বহুল রাডার ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে এই সংঘাত ওয়াশিংটনের জন্য সামরিক ও ভাবমূর্তির দিক থেকে চাপ তৈরি করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অল্প সময়েই অন্তত ১৭টি আকাশযান ভূপাতিত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যার মধ্যে রয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা রাডার, অত্যাধুনিক গোপন প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান এবং এমনকি একটি বিমানবাহী রণতরীও। যদিও সব ক্ষতি সরাসরি শত্রুপক্ষের হামলায় হয়নি, তবুও সামগ্রিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
যুদ্ধ শুরুর আগে খুব কম বিশ্লেষকই ধারণা করেছিলেন যে দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞায় থাকা এবং তুলনামূলক পুরোনো বিমানবাহিনী থাকা সত্ত্বেও ইরান এতটা ক্ষতি করতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তুলনামূলক কম খরচের অস্ত্র দিয়েই তারা অত্যাধুনিক ও ব্যয়বহুল সামরিক সরঞ্জামকে লক্ষ্যবস্তু করতে সক্ষম হয়েছে।
সংঘাত শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৬টি আকাশযান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১২টি ছিল নজরদারি ও আক্রমণ অভিযানে ব্যবহৃত ড্রোন। প্রতিটি ড্রোনের মূল্য প্রায় ৫৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার হওয়ায় শুধু এই খাতেই ক্ষতির পরিমাণ ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি।
এর পাশাপাশি ২ মার্চ কুয়েতে তিনটি যুদ্ধবিমান হারানোর ঘটনা ঘটে, যা নিজেদের গুলিতেই হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন। ১২ মার্চ ইরাকের আকাশে একটি জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান বিধ্বস্ত হলে তাতে থাকা ছয়জনই নিহত হন। একই ঘটনায় আরেকটি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১৯ মার্চ একটি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার ঘটনাও সামনে আসে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিমানটি জরুরি অবতরণ করেছে এবং পাইলট নিরাপদ রয়েছেন, তবে কীভাবে এই ঘটনা ঘটেছে তা স্পষ্ট করা হয়নি। যদি এই হামলা নিশ্চিত হয়, তবে এটি হবে বিশ্বের অন্যতম উন্নত যুদ্ধবিমানকে সফলভাবে আঘাত করার প্রথম ঘটনা।
অন্যদিকে, ইসরায়েলও ইরানের আকাশসীমায় এক ডজনের বেশি ড্রোন হারিয়েছে বলে জানা গেছে। সব মিলিয়ে দুই পক্ষের আকাশযান ক্ষতির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮-এ।
শুধু আকাশযান নয়, ইরানের হামলার বড় লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করা। বিশেষ করে ব্যয়বহুল রাডার ব্যবস্থাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
ইরানের সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, অন্তত চারটি গুরুত্বপূর্ণ রাডার ব্যবস্থা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। এর একটি জর্ডানে ধ্বংস হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবেও কয়েকটি স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে।
প্রতিটি রাডারের মূল্য ৩০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে। বিশ্বে এমন মোট ১০টি ব্যবস্থা রয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কাতারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিতে স্থাপিত আরও একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন রাডার আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। প্রায় ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এই রাডার দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করতে সক্ষম। কাতার কর্তৃপক্ষও ক্ষতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এই সংঘাতে আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যাধুনিক বিমানবাহী রণতরীও। সরাসরি শত্রুপক্ষের হামলায় নয়, বরং ভেতরে আগুন লাগার ঘটনায় এটি সাময়িকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে নাবিকদের ৩০ ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে।
ঘটনার কারণ নিয়ে তদন্ত চলছে। কিছু প্রতিবেদনে নাশকতার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে টানা দায়িত্ব পালন এবং অতিরিক্ত চাপও এই ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
যুদ্ধের আরেকটি বড় দিক হলো ব্যয়। মাত্র ছয় দিনের মধ্যেই গোলাবারুদের পেছনে ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ হয়েছে বলে একটি গবেষণা সংস্থা জানিয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে শুধু অস্ত্র ব্যবহারে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার, এবং ইতোমধ্যে ৩০০টির বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে শুধু এই খাতেই ব্যয় হয়েছে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত ২০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে, যাতে অস্ত্রের মজুত পুনরায় গড়ে তোলা যায় এবং উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হয়।
এই সংঘাতে তথ্যযুদ্ধও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরান একটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করলেও ইসরায়েল তা অস্বীকার করেছে। তাদের মতে, বিমানটি লক্ষ্যবস্তু হলেও কোনো ক্ষতি হয়নি। এ ধরনের বিপরীতমুখী দাবি যুদ্ধক্ষেত্রের প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝাকে কঠিন করে তুলছে।
সব মিলিয়ে, এই সংঘাত শুধু সরাসরি সামরিক ক্ষতিই নয়, বরং আধুনিক যুদ্ধের ধারণাকেও নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। তুলনামূলক কম খরচে তৈরি অস্ত্র দিয়ে কীভাবে অত্যাধুনিক ও ব্যয়বহুল সরঞ্জামকে চ্যালেঞ্জ জানানো যায়—ইরান সেই উদাহরণ তুলে ধরেছে।
যুদ্ধ চলতে থাকলে এই ক্ষয়ক্ষতির কৌশলগত প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে ভবিষ্যৎ সংঘাতে শক্তির ভারসাম্য এবং যুদ্ধের ধরন—দুটিই নতুনভাবে মূল্যায়ন করা হতে পারে।

