ভারত মহাসাগরের দূরবর্তী দ্বীপে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটি ডিয়েগো গার্সিয়াকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে—এমন অভিযোগ ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তবে এই হামলার দায় সরাসরি অস্বীকার করেছে ইরান, ফলে ঘটনাটি নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা ও নানা প্রশ্ন।
২২ মার্চ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য এই ঘটনাকে “বেপরোয়া হুমকি” বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের দাবি, ইরানের পক্ষ থেকেই এই হামলার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু তেহরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্পষ্ট করে বলেছেন, এই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
ঘটনাটি সামনে আসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার পর। ওই অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে দুর্বল করা। যদিও ইরান বারবার দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
কী ঘটেছিল?
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার ভোরের মধ্যে ডিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। এর একটি মাঝপথেই বিকল হয়ে যায়, আরেকটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করা হয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘটনার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। উল্লেখ্য, এই ঘাঁটিটি ইরান থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, যা এই ঘটনার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি সত্যিই এত দূরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার চেষ্টা হয়ে থাকে, তাহলে এটি ইরানের সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তৈরি করে। এতদিন ধারণা ছিল, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা সর্বোচ্চ ২ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ।
একজন গবেষকের মতে, এই ঘটনা যদি সত্যি হয়, তাহলে ইউরোপের অনেক শহরও একই ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। ফলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্যও এটি নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ইরানের অবস্থান কী?
ইরান শুরু থেকেই এই হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এর আগেই জানিয়েছিলেন, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ২ হাজার কিলোমিটারের নিচে সীমাবদ্ধ রেখেছে, যাতে অন্য দেশগুলো তাদের হুমকি হিসেবে না দেখে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সাধারণত এমন হামলার দায় অস্বীকার করে, যা বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে বা নতুন সংঘাতের সীমা অতিক্রম করে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই ঘটনাকে “বেপরোয়া” আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, তারা সরাসরি কোনো আক্রমণাত্মক সামরিক পদক্ষেপে যুক্ত হতে চায় না।
তাদের মতে, এই সংঘাতে তাদের ভূমিকা মূলত নিজেদের নাগরিক ও সেনাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা রক্ষাকেও তারা যৌথ আত্মরক্ষার অংশ হিসেবে দেখছে।
ইসরায়েলের সামরিক প্রধান দাবি করেছেন, ইরান এই হামলায় প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার পাল্লার দুই ধাপের আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। তার মতে, এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েল নয়, বরং আরও দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা দেখাতে ব্যবহার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই ধরনের অস্ত্র ইউরোপের রাজধানীগুলোকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
কেন ডিয়েগো গার্সিয়া গুরুত্বপূর্ণ?
ডিয়েগো গার্সিয়া শুধু একটি সামরিক ঘাঁটি নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের বহু বড় সামরিক অভিযানের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে প্রায় আড়াই হাজার সেনা সদস্য অবস্থান করেন এবং এটি ভিয়েতনাম থেকে শুরু করে আফগানিস্তান পর্যন্ত বিভিন্ন যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ভারত মহাসাগরের মাঝখানে অবস্থিত এই দ্বীপটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান থেকে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত সামরিক তৎপরতা চালানো সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাটি যুদ্ধের ভৌগোলিক পরিসর আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদি সত্যিই দূরবর্তী ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সংঘাত আরও জটিল ও বিস্তৃত হতে পারে।
একজন বিশ্লেষক বলেন, ইরান সরাসরি প্রচলিত যুদ্ধ জিততে চাইছে না, বরং যুদ্ধের খরচ ও ঝুঁকি বাড়িয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে চাইছে। দূরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার হুমকি সেই কৌশলেরই অংশ হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ডিয়েগো গার্সিয়াকে ঘিরে এই ঘটনাটি এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। অভিযোগ, অস্বীকার আর পাল্টা দাবির ভেতর দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট—এই যুদ্ধ ধীরে ধীরে নতুন মাত্রা নিচ্ছে, আর তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে আরও বিস্তৃত অঞ্চলে।

