ইরানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই একটি শক্তিশালী বর্ণনা চালু আছে—দেশটি নাকি বিশ্বের অন্যতম ‘সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষক’। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই ধারণাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। অনেক বিশ্লেষক এখন বলছেন, বাস্তবে ইরান নিজেই বহিরাগত হামলা ও সহিংসতার শিকার।
লেখক বেলেন ফার্নান্দেজ তাঁর বিশ্লেষণে তুলে ধরেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানকে ‘বিশ্বের এক নম্বর সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষক’ বলে আখ্যা দেন, তখন তা আসলে এক ধরনের আত্মপ্রতিফলন হিসেবেও দেখা যেতে পারে। কারণ একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে, যার ফলে বিপুল প্রাণহানি ঘটছে।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে ইরানে সহিংসতার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত ১,৪০০ জন বেসামরিক নাগরিক। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলা, যেখানে ১৭০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়—যাদের বেশিরভাগই ছিল স্কুলছাত্রী।
এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, যদি এমন ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে ঘটত, তবে বিশ্বব্যাপী তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যেত। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে পশ্চিমা গণমাধ্যম অনেকটাই নীরব ছিল, যা দ্বৈত মানদণ্ডের ইঙ্গিত দেয়।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ইরান দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছে। দেশটির বিজ্ঞানীরা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, যার পেছনে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ-এর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে, মুজাহেদিন-ই-খালক নামের সংগঠনটির হামলায় হাজারো ইরানি প্রাণ হারিয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির ইতিহাসও কম বিতর্কিত নয়। ভিয়েতনাম থেকে আফগানিস্তান—বিভিন্ন দেশে সরাসরি বা পরোক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর অভিযোগ রয়েছে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, গাজা উপত্যকা-তে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ও সামরিক সহায়তা নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। সেখানে নিহতের সংখ্যা ৭২ হাজার ছাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হচ্ছে।
সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা অনুযায়ী—যদি কোনো পক্ষ পরিকল্পিতভাবে সহিংসতা ব্যবহার করে জনগণের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে চায়, তাহলে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠে: এই সংজ্ঞার সঙ্গে কার কার্যক্রম বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ?
ইরান বরাবরই দাবি করে এসেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত। এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও বলছেন, দেশটি তাৎক্ষণিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে নেই। তবুও এই ইস্যুকেই কেন্দ্র করে যুদ্ধের যৌক্তিকতা দাঁড় করানো হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসবাদী’ তকমা আরোপের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। বাস্তবে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক চাপ এবং সামরিক হামলার শিকার—যা সাধারণ মানুষের জীবনকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করেছে।
সব মিলিয়ে বর্তমান বাস্তবতা একটি জটিল চিত্র তুলে ধরে। একদিকে ইরানকে ঘিরে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ, অন্যদিকে সেই দেশটিই বড় ধরনের সামরিক আক্রমণের শিকার। ফলে প্রশ্নটি এখন আরও জোরালো—সন্ত্রাসের আসল সংজ্ঞা কী, এবং কে বা কারা সেই সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে?

