আরটির বিশ্লেষণ—
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ইরানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দীর্ঘদিন ধরে ফতোয়া জারি করে রেখেছিলেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সেই সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি।
এ পরিস্থিতিতে দেশটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড়িয়ে আছে—তারা কি আগের মতো ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা মেনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত থাকবে, নাকি নতুন বাস্তবতায় নিজেদের নীতি পরিবর্তন করবে? রাশিয়ার সংবাদমাধ্যম আরটি এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে।
সম্প্রতি ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ইরানের পারমাণবিক নীতি নিয়ে তাঁর অবস্থান ঘোষণা করবেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, তেহরান আগের কঠোর অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসে নতুনভাবে ভাবছে।
এ বিষয়টির কেন্দ্রবিন্দু হলো সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির দেওয়া একটি ‘ফতোয়া’। এ ফতোয়ায় ইসলামী আইনের ভিত্তিতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ইরানে এই ফতোয়া শুধু ধর্মীয় মত নয়, এটি রাষ্ট্রীয় নীতির মতোই গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক দশক ধরে ইরান এ ফতোয়ার ওপর ভিত্তি করেই বলেছে যে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল কাউন্টারটেররিজম সেন্টারের সদ্য সাবেক প্রধান জো কেন্টও বলেছেন, ২০০৪ সালে কার্যকর হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ইরান ওই ফতোয়া লঙ্ঘন করেছে—এমন কোনো প্রমাণ মার্কিন গোয়েন্দাদের কাছে নেই। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ)ও একই ধরনের মতামত দিয়েছে।
তবে এ ফতোয়া স্থায়ী বা অপরিবর্তনীয় নয়। পরিস্থিতি বদলালে এটি পরিবর্তন বা বাতিলও করা যেতে পারে। নতুন নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনি চাইলে নতুন ফতোয়া দিতে পারেন, যা বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
এখানে ‘তাকিয়া’ নামে একটি ধারণাও গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ হলো—বিপদের সময় নিজের অবস্থান গোপন রাখা বা পরিবর্তন করা। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও এটি প্রয়োগ হতে পারে, যেখানে দেশের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য আগের নীতি পরিবর্তন করা বৈধ হতে পারে।
ইরানে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে—পারমাণবিক অস্ত্র থাকা উচিত কি না। কেউ কেউ মনে করেন, শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এটি জরুরি। কারণ, যেসব দেশের পারমাণবিক অস্ত্র আছে, তাদের ওপর সাধারণত সরাসরি হামলা হয় না।
এ যুক্তির পক্ষে উদাহরণ হিসেবে উত্তর কোরিয়ার কথা বলা হয়। দেশটি পারমাণবিক শক্তিধর হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেয়নি, বরং আলোচনায় বসেছে। অন্যদিকে লিবিয়ার উদাহরণও গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির নেতা মুহাম্মার গাদ্দাফি পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করেছিলেন। কিন্তু পরে ২০১১ সালে পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপে তাঁর সরকার পতন হয় এবং তিনি নিহত হন। এতে ইরানের অনেকেই মনে করেন, প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকলে ঝুঁকি বাড়ে।
এ কারণে ইরান এখন দুটি পথের মধ্যে অবস্থান করছে—উত্তর কোরিয়ার মতো পারমাণবিক শক্তিধর হওয়া অথবা লিবিয়ার মতো নিরস্ত্র হয়ে ঝুঁকির মুখে পড়া।
তবে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করলে নতুন ঝুঁকিও তৈরি হবে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে। যেমন তুরস্ক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও মিশরও একই পথে যেতে পারে। এতে পুরো অঞ্চল আরও অস্থির হয়ে উঠবে।
এ কারণে এতদিন ইরান একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অনুসরণ করেছে—তারা প্রযুক্তি উন্নয়ন করেছে; কিন্তু পুরোপুরি অস্ত্র তৈরির দিকে যায়নি। এতে তারা আলোচনার সুযোগও ধরে রেখেছে।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি আগের মতো নয়। নতুন নেতৃত্ব, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক চাপ—সব মিলিয়ে পুরোনো কৌশল হয়তো আর কার্যকর হবে না।
এখন ইরানের সামনে বড় প্রশ্ন—তারা কি আগের মতো সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি আরও শক্ত প্রতিরক্ষা নীতি গ্রহণ করবে? এ সিদ্ধান্ত শুধু আদর্শের নয়, বরং বাস্তব নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
সম্ভবত ভবিষ্যতে নতুন ফতোয়ার মাধ্যমে পারমাণবিক সক্ষমতাকে নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় বলে ঘোষণা করা হতে পারে। ধর্মতাত্ত্বিক পটভূমি এবং দেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থানের কারণে মোজতবা নিঃসন্দেহে এর গুরুত্ব বুঝছেন এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্বকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন। তাই ধর্মীয় ও রাজনৈতিক যুক্তির সমন্বয়ে নতুন নীতি তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরান এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পথে দাঁড়িয়ে আছে। এ কারণে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিকে শুধু একটি মন্তব্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি সুচিন্তিত সংকেত হিসেবে কাজ করছে যে, তাদের পারমাণবিক নীতি নতুনভাবে মূল্যায়নের পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে ধর্ম, আইন এবং ভূরাজনীতি—সবকিছু একসঙ্গে জড়িয়ে আছে।

