মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যেই নতুন কূটনৈতিক তৎপরতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রস্তাব পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের কাছে পৌঁছানো হয়েছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনার স্থান হিসেবে পাকিস্তান বা তুরস্কের নাম বিবেচনায় রয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
তবে এই ইতিবাচক ইঙ্গিতের মধ্যেও ইরান প্রকাশ্যে কোনো আলোচনা চলছে—এমন দাবি অস্বীকার করে আসছে। তারা বারবার বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনায় বসার প্রশ্নই আসে না।
পাকিস্তান ইতোমধ্যেই জানিয়েছে, তারা চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে দ্রুত আলোচনা আয়োজন করতে প্রস্তুত। তুরস্কও একইভাবে বার্তা আদান-প্রদানে ভূমিকা রাখছে এবং সম্ভাব্য আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো প্রস্তাবের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি, ধারণা করা হচ্ছে এতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা, উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম মজুত সরিয়ে নেওয়া, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সহায়তা বন্ধ করার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই প্রস্তাব সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। প্রায় চার সপ্তাহ ধরে চলা যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। ফলে সম্ভাব্য আলোচনার খবরে বিনিয়োগকারীরা আশাবাদী হয়ে উঠেছেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরও সামরিক শক্তি জোরদার করছে। অতিরিক্ত কয়েক হাজার সেনা পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে প্রয়োজনে স্থল অভিযানের সুযোগ বাড়ে। এর আগে নৌবাহিনীর একটি বড় বহরও ওই অঞ্চলের উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে।
তবে ইরান এখনো কঠোর অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশটির সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে কড়া ভাষায় মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ইরান কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে যাবে না—এখন নয়, ভবিষ্যতেও নয়।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও একই সুরে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা চলছে না। তাদের দাবি, যুদ্ধ শুরুর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কূটনীতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তাই নতুন করে আলোচনার কোনো ভিত্তি নেই।
অন্যদিকে ইসরায়েল এই প্রস্তাব নিয়ে সন্দিহান। দেশটির নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, ইরান হয়তো এই শর্তগুলো সহজে মেনে নেবে না। একই সঙ্গে তারা আশঙ্কা করছে, আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্র কিছু ছাড় দিতে পারে, যা ইসরায়েলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিস্থিতি প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। ইসরায়েল ইরানে একের পর এক বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। জাহাজ ও সাবমেরিন নির্মাণ স্থাপনাসহ বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে তেহরানের একটি আবাসিক এলাকাতেও হামলার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের খুঁজছেন।
ইরানও পাল্টা জবাব হিসেবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তেল আবিবসহ বিভিন্ন এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি কুয়েত, জর্ডান ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
এছাড়া কুয়েত ও সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা নতুন করে চালানো ড্রোন হামলা প্রতিহত করেছে। কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি জ্বালানি ট্যাংকে আঘাত হানার ঘটনায় আগুন লাগলেও কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, যা বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। যদিও ইরান জানিয়েছে, নিরপেক্ষ জাহাজগুলো তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে চলাচল করতে পারবে, বাস্তবে খুব কম সংখ্যক জাহাজই এই পথ ব্যবহার করতে পারছে।
সব মিলিয়ে, একদিকে যুদ্ধ অব্যাহত থাকলেও অন্যদিকে আলোচনার সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। তবে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও কঠোর অবস্থানের কারণে এই আলোচনা আদৌ বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

