হরমুজ প্রণালী বিশ্বের একমাত্র বাণিজ্যিক নৌপথ যা প্রাচীন পারস্যের দেবতা আহুরা মাযদার নামে পরিচিত। এই নাম কেবল ঐতিহাসিক বা সাংস্কৃতিক রূপক নয়; এটি প্রতিফলিত করে সেই প্রাচীন বিশ্বাস যে, এই জলপথটি সৃষ্টির নিয়ম ও জগতের ক্রমকে নিয়ন্ত্রণ করে।
প্রাচীন পারস্যরা এটিকে একটি সাধারণ বাণিজ্যিক রুট হিসেবে তৈরি করেননি; তারা এটিকে পবিত্র স্থানে পরিণত করেছিলেন। আজ সেই পবিত্র প্রণালী বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল বিন্দুতে পরিণত হয়েছে। মাত্র ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ৩৯ কিলোমিটার প্রশস্ত এই নৌপথে বছরে প্রায় ৩০,০০০ জাহাজ চলাচল করে। এগুলো শুধু তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাস বহন করে না; এগুলো বহন করে সার, অ্যালুমিনিয়াম, হেলিয়াম, পেট্রোকেমিক্যালস এবং এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ পণ্য যা বৈশ্বিক কৃষি, শিল্প, ও প্রযুক্তি উৎপাদনকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
হরমুজ প্রণালী শুধু একটি চ্যানেল নয়; এটি বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার “কার্ডিয়াক ভালভ”। যে কোনো সময় এই ভালভ বন্ধ হলে, পৃথিবীর সরবরাহ চেইন ধীরগতি বা পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে। খাদ্য, ধাতু, প্রযুক্তি, এবং তেলের সরবরাহ—সবই এখানে একত্রিত। এই প্রণালীর গুরুত্ব বোঝার জন্য আমাদের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।
১১শ শতকে আরব চিফ মুহাম্মদ দিরামকু হরমুজে রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি যুদ্ধবিগ্রহের চেয়ে বাণিজ্যের কৌশলে পারদর্শী ছিলেন। প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে তিনি বুঝেছিলেন যে, এই অঞ্চলটি কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্যের কেন্দ্র। ১৫শ শতকে হরমুজ মধ্যযুগীয় বিশ্বের প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ব্যবসায়ীরা মিশর, চীন, জাভা, বেঙ্গল, জাঞ্জিবার ও ইয়েমেন থেকে এখানে আসতেন। ভেনিসের মার্কো পোলো এবং চীনের প্রাচীন নৌবাহিনীর নাবিক জেং হরমুজকে দেখেছেন এবং বাণিজ্যিক কৌশলের মাধ্যমে এই প্রণালীর গুরুত্ব নিশ্চিত করেছেন।
পর্তুগিজরা ১৫০৭ সালে প্রণালী দখল করে এবং বুঝতে পারে যে, যারা এই চ্যানেল নিয়ন্ত্রণ করে, তারা ভারত থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত পুরো বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ১৬২২ সালে পারস্যের শাহ আব্বাস ইংরেজ নৌবাহিনীর সাহায্যে হরমুজ দখল করেন। ১৯৫১ সালে ব্রিটিশরা প্রণালী অবরোধ করে ইরানের তেল জাতীয়করণের বিরোধিতা করেছিল। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, প্রাচীনকালের নীতি এবং আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতির কৌশল একই রকম: যে দেশ এই প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করে, সে বিশ্বের সরবরাহ চেইনের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখে।
প্রাচীন ইতিহাসের সঙ্গে আজকের পরিস্থিতি অদ্ভুতভাবে মিল রয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে হরমুজ প্রণালী আংশিকভাবে বন্ধ হয়। ড্রোন হামলা, জাহাজ হামলা, এবং বাণিজ্যিক বিমার সমস্যার কারণে প্রণালী কার্যত স্থবির। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে, এটি শুধু একটি সরবরাহ ব্যাহত নয়; এটি বৈশ্বিক বাণিজ্যের “কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট”। অর্থাৎ, প্রণালী বন্ধ না হলেও, আর্থিক ও আইনগত বাধার কারণে জাহাজ চলাচল করতে পারছে না। ইউরোপীয় ব্যাংক এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হরমুজ নির্ভর চালানের জন্য ক্রেডিট বাতিল করেছে। $৭ বিলিয়ন জরুরি ক্রেডিট লাইন স্থাপন করা হলেও তা সীমিত কার্যকর হয়েছে। বিকল্প বন্দরও হামলার শিকার হওয়ায় এ পরিস্থিতি আরও জটিল।
প্রণালী বন্ধ হলে শুধু তেল নয়, কৃষি ও শিল্পের অপরিহার্য উপাদানও বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্বের অ্যামোনিয়ার ৩০%, ইউরিয়ার প্রায় ৫০%, ডায়অ্যামোনিয়াম ফসফেটের ২০% এই প্রণালী দিয়ে যায়। হেলিয়ামের এক-তৃতীয়াংশ, অ্যালুমিনিয়ামের ১০%, এবং প্লাস্টিকের উল্লেখযোগ্য অংশও এখানে যায়। এসব উপাদান সরবরাহ বন্ধ হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্ব কৃষি উৎপাদন, ধাতু উৎপাদন, প্রযুক্তি ও খাদ্য নিরাপত্তায় বিপর্যস্ত হবে। বিশেষ করে সারা বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষ যাকে সারের মাধ্যমে খাদ্য সরবরাহ করা হয়, তারা সরাসরি প্রভাবিত হবে।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়া মানে শুধু জলপথ বন্ধ নয়; এটি বিশ্বের আর্থিক ব্যবস্থা, বীমা শিল্প, এবং সরবরাহ চেইনের উপরও প্রভাব ফেলে। যেসব দেশ খাদ্য ও কাঁচামাল আমদানি করে, তারা প্রায় পুরোপুরি নির্ভরশীল এই ৩৯ কিলোমিটার প্রণালীতে। সৌদি আরব তার খাদ্যের ৮০% আমদানি করে, কাতার ৮৫%। এই প্রণালী বন্ধ হলে স্থানীয় বাজার ও বৈশ্বিক বাজার উভয়ই তীব্র চাপের মধ্যে পড়বে।
২০২৬ সালের এই সংকট দেখিয়েছে, একক ভৌগোলিক বিন্দুর উপর নির্ভরতা বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। সুতরাং হরমুজ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের চ্যানেল নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির সমন্বয়ক এবং সাপ্লাই চেইনের হৃদপিন্ড। একটিমাত্র ৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রণালী আজও বিশ্বের সরবরাহ চেইন স্থবির করতে পারে।
এই সংকট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: বৈশ্বিক অবকাঠামো এবং নিরাপত্তার জন্য হরমুজকে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। একাধিক দেশের সমন্বিত নিরাপত্তা, স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ, এবং অবকাঠামো বিস্তারের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো আবশ্যক। কেবল তেলের নিরাপত্তা নয়, সার, ধাতু, খাদ্য ও প্রযুক্তি উপাদানও এখানে অন্তর্ভুক্ত।
প্রাচীন পারস্যের দেবতার নামে নামকৃত হরমুজ প্রণালী আজও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এই দেবতার মতো ক্ষমতা রাখে—যে কোনো সময়, একক সিদ্ধান্ত বা ঘটনা পুরো বিশ্বের উৎপাদন ও সরবরাহ চেইনকে স্থবির করতে পারে। এ জন্য বৈশ্বিক সম্প্রদায়কে কেবল প্রতিক্রিয়াশীল না হয়ে, সক্রিয়ভাবে প্রণালী এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের স্থায়ী নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নিতে হবে।

