মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমার পর হরমুজ প্রণালিতে নৌপরিবহন পুনরায় শুরু করার লক্ষ্যে ফ্রান্স বৃহস্পতিবার প্রায় ৩৫টি দেশের সঙ্গে সমন্বিত আলোচনা চালিয়েছে। ফরাসি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে জানা যায়, এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রাথমিক মতামত এবং সম্ভাব্য মিশনের রূপরেখা জানা। আলোচনায় ফ্রান্সের সামরিক প্রধান ফ্যাবিয়েন ম্যান্ডন নেতৃত্ব দিয়েছেন, তবে বৈঠকে কোন দেশের নাম প্রকাশ করা হয়নি।
ফ্রান্সের উদ্যোগটি স্বতন্ত্রভাবে প্রতিরক্ষামূলক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মূল লক্ষ্য হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত শেষ হওয়ার পর হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করা। ফরাসি নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল নিকোলা ভোজ্যুর জানিয়েছেন, তিনি ব্রিটেন, জার্মানি, ইতালি, ভারত ও জাপানসহ ১২ দেশের নৌবাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে মতবিনিময় করেছেন।
“সমুদ্র আমাদের বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধমনি,” তিনি এক্স (সাবেক টুইটার)-এ লিখেছেন। এই কথায় স্পষ্ট হয়, হরমুজ প্রণালি শুধু তেল বা জ্বালানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে শুধুমাত্র তখন, যখন সংঘাত কমে যাবে, বীমা ও শিপিং কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় হবে এবং ইরানের সম্মতি পাওয়া যাবে। ফ্রান্স ইতিমধ্যেই পূর্ব ভূমধ্যসাগরে একটি বিমানবাহী রণতরীসহ স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন করেছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে দুটি হেলিকপ্টারবাহী জাহাজ এবং আটটি যুদ্ধজাহাজ পাঠানো হয়েছে, যা সম্ভাব্য মিশনের প্রস্তুতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান সরকারের অনুরোধে তিনি দেশটির জ্বালানি স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা আরও ১০ দিনের জন্য স্থগিত রাখছেন। একই সঙ্গে ব্রিটেনও ঘোষণা করেছে, তারা মিত্রদের সঙ্গে মিলিয়ে প্রণালি পুনরায় চালু করার একটি ‘কার্যকর’ পরিকল্পনা প্রণয়নের পথে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা না কমলে এই কাজটি অত্যন্ত কঠিন হবে।”
সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে সমুদ্রের মাইন শনাক্ত ও অপসারণে জোর দেওয়া হতে পারে। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে ওই এলাকায় চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া হবে। তবে মাইন অপসারণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের এককভাবে এই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা সীমিত। এই পরিস্থিতিতে ফ্রান্স, ব্রিটেন এবং অন্যান্য মিত্র দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছে।
আনুমানিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে হলে কৌশলগতভাবে তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে: এক, শত্রুতা বা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা; দুই, আন্তর্জাতিক সমন্বয় এবং অংশগ্রহণকারী দেশের সমর্থন; তিন, বীমা ও শিপিং সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বিত কার্যক্রম।
এ ব্যাপারে ফরাসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই উদ্যোগকে এক ধরনের ‘আঞ্চলিক প্রতিরক্ষামূলক কাঠামো’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মূল উদ্দেশ্য হলো হরমুজ প্রণালিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং নৌপরিবহনের জন্য নিরাপদ রাখা। এটি শুধু তেল পরিবহনের জন্য নয়, বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি এবং স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব কেবল তেল নয়, বরং এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ ধমনি। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই প্রণালির মাধ্যমে পরিবহন হয়। ইরানের সঙ্গে সংঘাত চলাকালীন জাহাজে হামলার কারণে নৌপরিবহন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের পরও, সম্ভাব্য হুমকি রয়ে গেছে, যা আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে সতর্ক করেছে।
ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মিশন গঠনের চেষ্টা হলো, এমন হুমকির মোকাবিলা এবং প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে বাস্তবতা হলো, এই প্রক্রিয়ায় নানাবিধ রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং সামরিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আন্তর্জাতিক সমন্বয় ছাড়া এই প্রক্রিয়া কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন।
ফ্রান্সের নেতৃত্বে ৩৫ দেশের সঙ্গে আলোচনা হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রাথমিক পদক্ষেপ। যদিও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অংশ নিচ্ছে না, তবে আন্তর্জাতিক সমর্থন ও সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যৎ হরমুজ মিশন কেবল মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ শেষে এই মিশন কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে হরমুজ প্রণালির পুনরায় নিরাপদ নৌপরিবহন নিশ্চিত হবে, যা আন্তর্জাতিক বাজার ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

