মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে উত্তেজনা তীব্র হওয়ায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে কমে গেছে। এক সময় যেখানে প্রতিদিন শতাধিক জাহাজ চলাচল করত, এখন সেখানে মাত্র কয়েকটি জাহাজ সীমিতভাবে চলাচল করছে। এতে শুধু জ্বালানি নয়, বিশ্বব্যাপী পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
তেল ও গ্যাস পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে ইতোমধ্যেই জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করেছে। অনেক দেশে, বিশেষ করে ইউরোপে, গৃহস্থালির জ্বালানি ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে পরিস্থিতির প্রভাব জ্বালানিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না—এর ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে।
উপসাগরীয় অঞ্চল বিশ্বে সার উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র। ইউরিয়া, অ্যামোনিয়া, পটাশ ও ফসফেটের বড় অংশ এই পথ দিয়ে রপ্তানি হয়। চলমান সংকটে এসব পণ্যের সরবরাহ কমে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন উত্তর গোলার্ধে চাষাবাদের মৌসুম চলায় এই সময়ের ঘাটতি সরাসরি ফসল উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি স্বল্প সময়ের বিঘ্নও পুরো মৌসুমে ক্ষতি ডেকে আনতে পারে, যার ফল হিসেবে খাদ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ হিলিয়াম কাতার থেকে আসে, যা হরমুজ প্রণালি হয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছায়। সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে কাতারের বড় উৎপাদন কেন্দ্র কার্যক্রম বন্ধ রাখায় সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই গ্যাস সেমিকন্ডাক্টর ও মাইক্রোচিপ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ফলে এর ঘাটতি স্মার্টফোন, ইলেকট্রনিক পণ্য এমনকি চিকিৎসায় ব্যবহৃত এমআরআই পরীক্ষার খরচও বাড়িয়ে দিতে পারে।
মিথানল ও ইথিলিনের মতো পেট্রোকেমিক্যাল উপাদান ওষুধ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উপসাগরীয় দেশগুলো এসব কাঁচামালের বড় সরবরাহকারী। বিশ্বের বড় জেনেরিক ওষুধ উৎপাদক দেশ ভারতও এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরবরাহ ব্যাহত হলে ওষুধের উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে, যার প্রভাব পড়বে ভোক্তা পর্যায়ে।
সালফার, যা তেল ও গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণের উপজাত, ব্যাপকভাবে এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এটি সার উৎপাদনের পাশাপাশি ধাতু প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত হয়। সালফার থেকে উৎপাদিত সালফিউরিক অ্যাসিড তামা, কোবাল্ট, নিকেল ও লিথিয়াম উত্তোলনে অপরিহার্য—যেগুলো ব্যাটারি তৈরির মূল উপাদান। ফলে সরবরাহ কমে গেলে বৈদ্যুতিক যানবাহন ও ইলেকট্রনিক পণ্যের দাম বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালির বর্তমান অচলাবস্থা বিশ্ব অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলছে। জ্বালানি, কৃষি, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য—প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ খাতেই এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

