বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে পেট্রল ও ডিজেলের ওপর আবগারি শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত সরকার। একই সঙ্গে জ্বালানি রপ্তানিতে নতুন করে কর আরোপ করা হয়েছে। সরকারের এই দ্বিমুখী পদক্ষেপে একদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারে চাপ কমানোর চেষ্টা, অন্যদিকে রাজস্ব ঘাটতি আংশিক সামাল দেওয়ার কৌশল স্পষ্ট হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর ইরানের হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এই প্রণালি দিয়ে ভারতের প্রায় ৪০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল আমদানি হয়। ফলে সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। এর প্রভাব সরাসরি পড়ে ভারতের জ্বালানি খাতে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে জানায়, পেট্রলের আবগারি শুল্ক লিটারপ্রতি ১৩ রুপি থেকে কমিয়ে ৩ রুপিতে নামানো হয়েছে। একইভাবে ডিজেলের শুল্ক ১০ রুপি থেকে শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। তবে এতে সরকারের কতটা রাজস্ব ক্ষতি হবে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো হিসাব প্রকাশ করা হয়নি।
নীতিগত এই পরিবর্তন এমন সময়ে এলো, যখন চারটি রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে নির্বাচন সামনে। ভারতে জ্বালানির দাম ভোটারদের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। ফলে রাজনৈতিক বিবেচনাও এই সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তেলমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যের কারণে তেল বিপণন কোম্পানিগুলো প্রতি লিটার পেট্রলে প্রায় ২৪ রুপি এবং ডিজেলে ৩০ রুপি পর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়ছে। শুল্ক কমানোর মাধ্যমে সেই চাপ কিছুটা লাঘবের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইমকেই গ্লোবালের অর্থনীতিবিদ মাধবী অরোরার মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে বছরে প্রায় ১ দশমিক ৫৫ ট্রিলিয়ন রুপি রাজস্ব কমতে পারে। তবে একই সঙ্গে তেল কোম্পানিগুলোর মোট ক্ষতির প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হবে।
ভারতে জ্বালানির খুচরা বাজারের প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে সব সময় খুচরা মূল্য সমন্বয় করে না। ফলে কখনো সরকার, কখনো কোম্পানিগুলো মূল্যবৃদ্ধির চাপ বহন করে, যা ভোক্তাদের কিছুটা সুরক্ষা দেয়।
এদিকে জ্বালানি রপ্তানিতেও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে সরকার। ডিজেল রপ্তানিতে লিটারপ্রতি ২১ দশমিক ৫ রুপি এবং বিমান জ্বালানিতে ২৯ দশমিক ৫ রুপি কর নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছরের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ভারত ১ কোটি ৪০ লাখ মেট্রিক টন পেট্রল এবং ২ কোটি ৩৬ লাখ টন ডিজেল রপ্তানি করেছে। বর্তমানে বেশির ভাগ রিফাইনারি রপ্তানি কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে। দেশটির বৃহৎ রপ্তানিকারকদের মধ্যে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ অন্যতম।
অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ জানিয়েছেন, দেশে পেট্রল, ডিজেল ও জেট ফুয়েলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। পাশাপাশি তেল বিপণন কোম্পানিগুলোকে সহায়তা দেওয়া হবে, যাতে সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ না পড়ে এবং বিমান জ্বালানির দাম স্থিতিশীল থাকে।
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে ভারত এখনো জ্বালানির জন্য ব্যাপকভাবে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এই বাস্তবতায় বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে।
অন্যদিকে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতে তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহ ২০ শতাংশ বাড়ানো হবে। এতে মোট সরবরাহ ধীরে ধীরে সংকট-পূর্ব সময়ের প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছাবে।

