মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এমন এক সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, যখন পুরোনো শত্রুতা, পুরোনো জোট আর পুরোনো নিরাপত্তা-সমীকরণ—সবকিছুই নতুন করে সাজানো হতে পারে। ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত যদি কোনো পর্যায়ে থামে বা অন্তত কমে আসে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—ইসরায়েলের কৌশলগত নজর এবার কোথায় যাবে? কে হবে তার পরবর্তী বড় উদ্বেগ?
ইসরায়েলি দৈনিক মাআরিভে প্রকাশিত বিশ্লেষক বোয়াজ গোলানির এক নিবন্ধে এমনই একটি সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। ‘পরিবর্তনশীল বালুচর’ শিরোনামের ওই লেখায় বলা হয়, ইরান যদি ধীরে ধীরে ইসরায়েলের প্রধান প্রতিপক্ষের অবস্থান হারায়, তাহলে সেই শূন্যস্থান পূরণের দৌড়ে সামনে চলে আসতে পারে তুরস্ক অথবা পাকিস্তান। বিষয়টি নিছক উত্তেজক শিরোনাম নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া এবং বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করছে।
গোলানির যুক্তি হলো, ইরান বহু বছর ধরে ইসরায়েলের নিরাপত্তা আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। কিন্তু যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ এবং সামরিক সক্ষমতার অবনমন—এসব কারণে তেহরান সেই অবস্থান কতদিন ধরে রাখতে পারবে, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে তিনি ইঙ্গিত দেন, ভবিষ্যতের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়তো আর আগের মতো হবে না; বরং নতুন দুই রাষ্ট্র—তুরস্ক ও পাকিস্তান—ইসরায়েলের কৌশলগত হিসাব-নিকাশে বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করবে।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, প্রতিযোগিতাটি এখন মূলত তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই মূল্যায়নের পেছনে কয়েকটি কারণও তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমত, দুটি দেশই জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক প্রভাবের দিক থেকে বড় শক্তি। তুরস্কে ৮ দশমিক ৫ কোটি এবং পাকিস্তানে ২৪ কোটি মানুষ বাস করে—এই পরিসংখ্যান শুধু জনসংখ্যা বোঝায় না, বরং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতার সম্ভাবনাও নির্দেশ করে। দ্বিতীয়ত, দুটি দেশই সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ, এবং উভয় দেশের ক্ষমতার কাঠামোয় রাষ্ট্রীয় শক্তি, সামরিক প্রভাব ও কঠোর জাতীয় নিরাপত্তা চিন্তাভাবনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তৃতীয়ত, বিশ্লেষণটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, উভয় দেশেরই শক্তিশালী সেনাবাহিনী রয়েছে এবং সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ও সম্পর্কও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়।
এখানেই বিশ্লেষণটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ ইসরায়েলের নিরাপত্তা-দর্শনে সরাসরি সামরিক শক্তির পাশাপাশি একটি বড় উপাদান হলো কূটনৈতিক ভারসাম্য—বিশেষ করে ওয়াশিংটনের সমর্থন। যে রাষ্ট্রগুলো একদিকে মুসলিম বিশ্বে প্রতীকী অবস্থান ধরে রাখতে পারে, অন্যদিকে আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও কাজ চালিয়ে যেতে পারে, তারা ইসরায়েলের চোখে বিশেষ মনোযোগের দাবিদার হবেই।
তুরস্ক কেন আলোচনায়?
গত এক সপ্তাহে ইসরায়েল ও তুরস্কের সম্পর্ক নতুন করে উত্তপ্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গাজা যুদ্ধ এবং সিরিয়ায় প্রভাব বিস্তার—এই দুই ইস্যুতে আঙ্কারা ও তেল আবিবের অবস্থান বহুদিন ধরেই পরস্পরবিরোধী। কিন্তু সাম্প্রতিক বাকযুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করেছে।
প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ানকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেন। তিনি এরদোয়ানের বিরুদ্ধে নিজ দেশের কুর্দি নাগরিকদের ওপর গণহত্যা চালানোর এবং ইরানের ‘সন্ত্রাসী রেজিম’ ও তাদের প্রক্সিদের মদদ দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। এসব অভিযোগ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুতর, এবং এগুলো কূটনৈতিক ভাষার চেয়ে রাজনৈতিক সংঘাতের ভাষা বেশি বলেই মনে হয়।
তুরস্ককে নিয়ে ইসরায়েলের উদ্বেগের পেছনে শুধু বাকযুদ্ধ নেই; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আঞ্চলিক নেতৃত্বের প্রশ্ন। গাজা ইস্যুতে তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম বিশ্বের একটি জোরালো কণ্ঠ হতে চেয়েছে। একই সঙ্গে সিরিয়ায় তার সক্রিয় উপস্থিতি, পূর্ব ভূমধ্যসাগরে কৌশলগত অবস্থান, এবং গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন মাত্রা—সব মিলিয়ে আঙ্কারা নিজেকে এমন এক আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে, যাকে উপেক্ষা করা কঠিন। ফলে ইসরায়েলের দৃষ্টিতে তুরস্ক শুধু রাজনৈতিক সমালোচক নয়; বরং সম্ভাব্য কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বীও।
পাকিস্তান কেন সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে?
অন্যদিকে, পাকিস্তানকে নিয়ে যে যুক্তি সামনে আনা হয়েছে, সেটিও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান একদিকে নিজেকে ইরান যুদ্ধের বৈশ্বিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে, অন্যদিকে দেশটির বহু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বহুদিন ধরেই ইসরায়েলের কঠোর সমালোচক।
বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফকে। প্রতিবেদনের দাবি, তিনি গত সপ্তাহে এক্সে একটি পোস্টে ইসরায়েলকে ‘শয়তান’ এবং ‘মানবতার জন্য অভিশাপ’ বলে উল্লেখ করেছিলেন, যদিও পোস্টটি পরে মুছে ফেলা হয়। তাৎপর্যপূর্ণ হলো, এই মন্তব্যটি করা হয়েছিল ঠিক সেই সময়ের কাছাকাছি, যখন পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতার ভূমিকায় যেতে চাইছিল।
এই দ্বৈত অবস্থান—একদিকে কূটনৈতিক মধ্যস্থতা, অন্যদিকে কঠোর রাজনৈতিক ভাষ্য—পাকিস্তানকে একটি জটিল রাষ্ট্রীয় চরিত্র দেয়। ইসরায়েলের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইসলামাবাদ সরাসরি সামরিক সংঘাতে না জড়িয়েও মুসলিম বিশ্বে প্রভাব বিস্তার, প্রতীকী অবস্থান এবং কূটনৈতিক ওজন বাড়াতে পারে। বিশেষ করে ২৪ কোটি মানুষের দেশ হিসেবে পাকিস্তানের বক্তব্য কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রশ্ন নয়; বরং তা বৃহত্তর মুসলিম জনমতের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
ইরান-পরবর্তী ভূরাজনীতির ইঙ্গিত কী?
এই পুরো আলোচনার সবচেয়ে বড় দিক হলো—এটি আসলে “নতুন শত্রু” খোঁজার গল্পের চেয়েও বড় কিছু। এটি ইঙ্গিত করছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতা হয়তো একক শত্রু বনাম একক মিত্র—এই সরল ফর্মুলা থেকে সরে যাচ্ছে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের নিরাপত্তা-উদ্বেগের কেন্দ্রে ছিল। কিন্তু যদি সেই সংঘাতের তীব্রতা কমে, তাহলে ইসরায়েলকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে, যেখানে প্রতিপক্ষ হয়তো সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বরং কূটনীতি, আঞ্চলিক প্রভাব, মতাদর্শিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক জোটের ভেতর থেকেও তৈরি হবে।
তুরস্ক ও পাকিস্তান—দুই দেশকে একই ফ্রেমে রাখার মধ্যে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা আছে। একটি দেশ আঞ্চলিক সামরিক-রাজনৈতিক শক্তি, অন্যটি পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র; উভয়েরই নিজস্ব ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব আছে। ইসরায়েলের জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে, এই দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক কখনো সম্পূর্ণ শত্রুতায়, কখনো আংশিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, আবার কখনো পরোক্ষ সমীকরণে গড়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের সংঘাত হয়তো আর একমাত্রিক হবে না।
যুক্তরাষ্ট্র ফ্যাক্টর কেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?
গোলানির নিবন্ধের উপসংহারে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক। তিনি সতর্ক করেছেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত থেমে গেলে তুরস্ক বা পাকিস্তানের মধ্যে কে বেশি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে, সেটি ইসরায়েলের হাতে নাও থাকতে পারে। কিন্তু তাদের মোকাবিলার প্রধান উপায় হিসেবে তিনি দেখছেন ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ককে।
এই পর্যবেক্ষণটি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ইসরায়েল জানে, শুধুমাত্র সামরিক শক্তি দিয়ে সব আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যায় না। আন্তর্জাতিক বৈধতা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রযুক্তিগত সহায়তা, অস্ত্র সরবরাহ, গোয়েন্দা সমন্বয়—সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ কৌশলে হয়তো তুরস্ক বা পাকিস্তানের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই প্রশ্ন: ওয়াশিংটন কাকে কতটা কাছে টানছে, আর কাকে কতটা দূরে রাখছে?
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি কখনো স্থির নয়; বরং এটি সবসময় পরিবর্তনশীল, স্তরবিন্যস্ত এবং বহুস্তরীয়। আজ যে দেশ প্রধান প্রতিপক্ষ, কাল সে হয়তো আলোচনার টেবিলে বসবে। আবার যে দেশ আজ সমালোচক, কাল সে আঞ্চলিক শক্তির নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। মাআরিভে প্রকাশিত এই বিশ্লেষণ সেই পরিবর্তিত বাস্তবতারই ইঙ্গিত দেয়।
তুরস্ক ও পাকিস্তানকে ঘিরে যে আলোচনা সামনে এসেছে, তা কেবল ইসরায়েলের নিরাপত্তা-উদ্বেগের প্রতিফলন নয়; বরং এটি মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব, আঞ্চলিক শক্তির পুনর্বিন্যাস, এবং যুক্তরাষ্ট্র-নির্ভর কৌশলগত ভারসাম্যের নতুন পাঠও তুলে ধরে। ইরানের ভূমিকা যদি সত্যিই কমে আসে, তাহলে শূন্যস্থান পূরণ করবে কে—এই প্রশ্নের উত্তর এখনও নিশ্চিত নয়। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার: মধ্যপ্রাচ্যের পরবর্তী অধ্যায়ে তুরস্ক ও পাকিস্তান—দুই নামই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

