মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পাওয়ার পর সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সামরিক সম্পর্ক আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত ঘনীভূত হওয়ার পর সৌদি ভূখণ্ডে পাকিস্তানের সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের খবর আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের সঙ্গে বিদ্যমান পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির অংশ হিসেবে পাকিস্তান সেখানে প্রায় ৮ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। শুধু সেনাই নয়, দেশটি পাঠিয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন এবং চীনের তৈরি একটি আধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এপ্রিলের শুরু থেকেই ধাপে ধাপে এই মোতায়েন কার্যক্রম শুরু হয় বলে জানা গেছে।
পাঠানো যুদ্ধবিমানগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই জেএফ-১৭ মডেলের, যেগুলো পাকিস্তান ও চীনের যৌথ উদ্যোগে তৈরি। একই সঙ্গে সৌদি আরবে স্থাপন করা হয়েছে চীনের এইচকিউ-৯ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ সৌদি আরব ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও ব্যবহার করছে। অর্থাৎ এখন দেশটির নিরাপত্তা কাঠামোয় একসঙ্গে মার্কিন ও চীনা প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মোতায়েন শুধু সামরিক সহায়তা নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন কৌশলগত বার্তা বহন করছে। বিশেষ করে ইরানের পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা বাড়ায় সৌদি আরব তার আকাশ প্রতিরক্ষা ও সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করতে চাইছে। পাকিস্তানের অংশগ্রহণ সেই উদ্বেগ কমানোরই একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কাতারের দোহায় হামাস প্রতিনিধিদের ওপর ইসরায়েলি হামলার পর সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন প্রতিরক্ষা সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়। এরপর থেকেই দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা আরও গভীর হতে শুরু করে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সেই সম্পর্ক এখন আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধের শুরুর দিকে সৌদি আরবের কয়েকজন বিশ্লেষক মন্তব্য করেছিলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্কের কারণে সৌদি আরব কার্যত পাকিস্তানের “পারমাণবিক নিরাপত্তা ছাতার” আওতায় রয়েছে। যদিও এ ধরনের বক্তব্য নিয়ে পাকিস্তান অস্বস্তিতে পড়ে এবং বিষয়টি নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বলে জানা গেছে। কারণ ইসলামাবাদ প্রকাশ্যে এমন কোনো বার্তা দিতে চায় না, যা সরাসরি আঞ্চলিক পারমাণবিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দিতে পারে।
তবে বাস্তবতা হলো, পাকিস্তানের এই সামরিক মোতায়েন সৌদি আরবকে স্পষ্ট নিরাপত্তা বার্তা দিয়েছে। রয়টার্সের তথ্যমতে, ভবিষ্যতে এই চুক্তির আওতায় সৌদি সীমান্ত সুরক্ষায় প্রায় ৮০ হাজার পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনাও আলোচনা হচ্ছে। এছাড়া পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের বিষয়টিও চুক্তির অংশ হিসেবে রয়েছে, যদিও সেগুলো এখন পর্যন্ত সৌদি উপকূলে পৌঁছেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালীর গুরুত্বও নতুন করে সামনে এসেছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি রুট কার্যত ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে লোহিত সাগরের বাব এল-মান্দেব প্রণালীতেও আগের মতো অনিশ্চয়তা রয়েছে, যেখানে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা অতীতে একাধিক জাহাজে হামলা চালিয়েছিল। ফলে সৌদি আরব এখন একযোগে আকাশ, সমুদ্র ও সীমান্ত নিরাপত্তা শক্তিশালী করার কৌশল নিয়েছে।
এই পুরো প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান শুধু সামরিক অংশীদার হিসেবেই নয়, কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী দেশ হিসেবেও ভূমিকা রাখছে। গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধবিরতি আলোচনায় মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছিল ইসলামাবাদ। সেই উদ্যোগকে সমর্থন দিয়েছিল সৌদি আরবও।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও দুই দেশের সম্পর্ক এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত পাকিস্তানকে ৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা দিয়েছে। পরে সৌদি আরব থেকেও অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা আসে, যা পাকিস্তানের অর্থনীতির জন্য বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াতে সৌদি আরব এখন তুরস্ককেও নিরাপত্তা সহযোগিতার কাঠামোয় যুক্ত করার চিন্তা করছে। মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রভাব মোকাবিলায় পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোকে রিয়াদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবেও দেখছেন বিশ্লেষকরা।

