আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং বিধ্বংসী যুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এক ব্যক্তির নেতৃত্বেই যা শুরু হয়েছিল, তিনি আডলফ হিটলার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মূল কারণ হিসেবে তাকে দায়ী করা হয়। কারণ তার আক্রমণাত্মক নীতি, সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব এবং রাজনৈতিক আদর্শ পৃথিবীজুড়ে ভয়াবহ সংঘর্ষ সৃষ্টি করেছিল। হিটলার তার নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, তিনি যে উপায়ে পুরো পৃথিবীকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন। তা ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
যুদ্ধের প্রকৃত কারণগুলির মধ্যে কিছু ছিল হিটলারের ব্যক্তিগত আদর্শ। তার স্বপ্নের “নব্য জার্মান সাম্রাজ্য” গঠন এবং তিনি যে “অপারেশন বারবারোসা” পরিকল্পনার মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়নকে আক্রমণ করেছিলেন। সেগুলো পুরো বিশ্বকে এক বিরাট সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দেয়। এখানে আমরা বিস্তারিতভাবে জানবো, কীভাবে হিটলার তার বিশাল ক্ষমতা এবং সামরিক শক্তি ব্যবহার করে পৃথিবীজুড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করেছিলেন।
আডলফ হিটলার ১৮৮৯ সালে অস্ট্রিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯১৯ সালে জার্মানির নাৎসি পার্টিতে যোগ দেন। তার রাজনৈতিক দর্শন ছিল একেবারে আগ্রাসী এবং তিনি একতরফা রক্ষা করতে চেয়েছিলেন জার্মানির শক্তি। বিশেষ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তাদের পরাজয়ের পর। ১৯২৩ সালে হিটলারের “বিয়ার হল পুর্দাচ্ছ” অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলেও, পরবর্তীকালে সে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়। ১৯৩৩ সালে চ্যান্সেলর হিসেবে জার্মানির সরকারে আসার পর তিনি একটানা নীতি গ্রহণ করতে থাকেন। যা পরে পৃথিবীজুড়ে ভয়াবহ যুদ্ধের জন্ম দেয়।
তার “লাইফস্পেস” (Living Space) বা “জীবনযাত্রার স্থান” ধারণাটি ছিল, জার্মানি ভবিষ্যতে পূর্ব ইউরোপ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপুল ভূখণ্ড দখল করে একটি বৃহৎ এবং শক্তিশালী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবে। হিটলার তার সেনাবাহিনীকে অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়ে সজ্জিত করতে শুরু করলেন এবং তার রাজনৈতিক আদর্শ গড়ে তুললেন এক সন্ত্রাসী এবং সঙ্ঘবদ্ধ জাতির মধ্যে।

হিটলার প্রথমেই তার “জীবনযাত্রার স্থান” তৈরির পরিকল্পনা শুরু করেন এবং এর প্রথম পদক্ষেপ ছিল অস্ট্রিয়া দখল করা। ১৯৩৮ সালে, “অ্যানশ্লুস” নামে পরিচিত একটি পরিকল্পনার মাধ্যমে তিনি অস্ট্রিয়াকে জার্মানির সঙ্গে একীভূত করেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তেমন কোনো প্রতিরোধ না থাকায়, এই অ্যানশ্লুস অত্যন্ত সহজেই সম্পন্ন হয়।
এর পর, ১৯৩৮ সালে হিটলার চেকোস্লোভাকিয়ার সুদেটেনল্যান্ড অঞ্চল দখল করতে শুরু করেন। যেখানে জার্মান জাতির লোকেরা বসবাস করত। যদিও মিউনিখ চুক্তি (১৯৩৮) অনুযায়ী- ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং ইতালি চেকোস্লোভাকিয়াকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে হিটলারের এই দখলদারিত্ব মেনে নিল। এর ফলে হিটলার আরও আক্রমণাত্মক মনোভাব গড়ে তোলে।

১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর হিটলার পোল্যান্ড আক্রমণ করেন। এটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা। পোল্যান্ড আক্রমণের পর, ব্রিটেন এবং ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। তার আগেই হিটলার এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা স্টালিন ১৯৩৯ সালের আগস্ট মাসে “মোলটভ-রিবেন্ট্রপ চুক্তি” স্বাক্ষর করেন। যা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, যাতে উভয় পক্ষ নিজেদের মধ্যে আক্রমণ না করার প্রতিশ্রুতি দেয়। এই চুক্তির মাধ্যমে হিটলারকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সাময়িক শান্তি স্থাপন করতে হয়েছিল। যার ফলে পোল্যান্ডের দখল সহজ হয়ে যায়।
পোল্যান্ডের আক্রমণের মাধ্যমে হিটলার পুরো ইউরোপে যুদ্ধের আঘাত আনেন এবং সারা পৃথিবী এই মহাযুদ্ধের আগুনে জ্বলে ওঠে। এর ফলে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হয়ে পড়ে। কারণ বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ এই যুদ্ধের সাথে জড়িত হয়ে যায়।

হিটলার প্রথম দিকে ইউরোপের পশ্চিম অংশেও জার্মানির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেন। ১৯৪০ সালের মে মাসে তিনি ফ্রান্স আক্রমণ করেন। তার সেনাবাহিনী “ব্লিটজক্রিগ” (Blitzkrieg) বা বিদ্যুত গতির আক্রমণ কৌশল ব্যবহার করে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ফ্রান্স দখল করে নেয়। এই দ্রুত বিজয়ের ফলে জার্মানি পশ্চিম ইউরোপে একটি শক্তিশালী অবস্থান লাভ করে।
ফ্রান্সের পতনের পর ব্রিটেন ছিল একমাত্র ইউরোপীয় দেশ যারা হিটলারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ছিল। “ব্রিটিশ যুদ্ধ বিমান” (Royal Air Force) এবং “ব্রিটিশ প্রতিরোধ” হিটলারের আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছিল এবং ব্রিটেন হিটলারের পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দেয়।
–
১৯৪১ সালের ২২ জুন, হিটলার তার সবচেয়ে বড় কৌশল “অপারেশন বারবারোসা” শুরু করেন। যার মাধ্যমে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে আক্রমণ করেন। এটি ছিল বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম বৃহৎ সামরিক অভিযান। প্রায় ৩ মিলিয়ন জার্মান সৈন্য ৩ হাজার ট্যাংক এবং ২ হাজার ৫০০ বিমান নিয়ে হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে অগ্রসর হন। যদিও প্রথমে সাফল্য লাভ করেছিলেন কিন্তু রাশিয়ার শীতকাল এবং সোভিয়েত সেনাদের প্রতিরোধের কারণে জার্মানির এই আক্রমণটি ব্যর্থ হয়ে যায়। স্ট্যালিনগ্রাদের যুদ্ধে হিটলার চূড়ান্ত পরাজয় স্বীকার করেন, যা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

হিটলার আরও একদিকে আক্রমণ শুরু করেছিলেন আফ্রিকা এবং পূর্ব এশিয়াতে। যেখানে তার মিত্র শক্তি ইতালি এবং জাপান সক্রিয় ছিল। ১৯৪১ সালে জাপান পার্ল হারবার আক্রমণ করে। যা আমেরিকাকে যুদ্ধের মধ্যে ঠেলে দেয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও জার্মানি, ইতালি এবং জাপান বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।
হিটলারের আক্রমণাত্মক মনোভাব এবং সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্য পৃথিবীজুড়ে যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হয় এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এক বিপর্যয়ে পরিণত হয়।

হিটলার তার আক্রমণাত্মক নীতি এবং সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্য থেকে পুরো পৃথিবীতে যুদ্ধ বাধিয়েছিলেন। তার দখলদারি পরিকল্পনা, ক্রুয়েল কৌশল এবং বিশ্বকে এক দিক থেকে ভ্রান্ত ধারায় ঠেলে দেওয়ার ক্ষমতা যুদ্ধের বিস্তৃতি ঘটায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে প্রায় ৭০ মিলিয়ন মানুষ নিহত হয় এবং অসংখ্য দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
হিটলারের নেতৃত্বে, জার্মানি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং বিপজ্জনক সামরিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার আগ্রাসী নীতি এবং সামরিক কৌশল তাকে পরাজয়ের দিকে ঠেলে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, হিটলারের নির্মমতা এবং তার আগ্রাসী মনোভাবকে ইতিহাসের একটি অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে গণ্য করা হয়।

