ইরাকের পার্লামেন্টে এক নতুন আইন নিয়ে বিতর্ক চলছে, যা নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও মতপ্রকাশের অধিকার কঠোরভাবে সীমিত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই আইন পাস হলে রাতের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হবে এবং ধর্মীয় গোষ্ঠী বা প্রতীককে অবমাননার অভিযোগে ১০ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে।
আইন অনুযায়ী, ভবিষ্যতে কোনো বিক্ষোভ আয়োজনের আগে অন্তত পাঁচ দিন আগে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। এছাড়া হাসপাতাল, স্কুল, সরকারি ভবন কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সড়কের আশপাশে জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করা হবে।
অন্যদিকে, যেকোনো ধরনের যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ বা জাতিগত-ধর্মীয় বিদ্বেষ উসকে দিলে ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ধর্মীয় প্রতীক অবমাননায় কমপক্ষে এক বছরের জেল ও ১০ লাখ দিনার জরিমানার প্রস্তাবও রয়েছে এই খসড়ায়।
মানবাধিকার সংগঠনের কড়া সমালোচনা
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং ইরাকের ডিজিটাল অধিকার নিয়ে কাজ করা INSM ফাউন্ডেশন এই খসড়াকে “ভয়াবহ” আখ্যা দিয়েছে। তারা বলেছে, সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে চলমান দমন-পীড়নের প্রেক্ষাপটে এই আইন আরও বিপজ্জনক অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ইরাক বিষয়ক গবেষক রাজার সালিহি বলেন,
“এই ধরনের আইন ইরাকের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতিকে লঙ্ঘন করে। সংসদ সদস্যদের উচিত এ আইন বাতিল বা সংশোধনের পক্ষে অবস্থান নেওয়া।”
তিনি আরও জানান, প্রস্তাবিত আইন সম্পর্কে জনপর্যায়ে কোনো স্বচ্ছতা নেই। সাধারণ নাগরিক ও সিভিল সোসাইটি বুঝতেই পারছে না আইনপ্রণেতাদের সামনে কী ধরনের খসড়া উপস্থাপন করা হয়েছে।
অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত অন্তত ২০ জনকে শুধুমাত্র মতপ্রকাশের জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে।
২০১৯ সাল থেকে ইরাকে নিয়মিত গণবিক্ষোভ হচ্ছে। বিদ্যুৎ সংকট, পানির ঘাটতি, দুর্নীতি এবং সরকারি বাহিনীঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সহিংসতার বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নামছে।
বিশেষ করে গ্রীষ্মের তীব্র গরমে (৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে) বিদ্যুৎ ও পানির সংকট ভয়াবহ রূপ নেয়। গত সপ্তাহে বাগদাদের দক্ষিণে হিল্লা ও দিবানিয়াহ শহরে কয়েক শত মানুষ সড়ক অবরোধ ও টায়ার পুড়িয়ে প্রতিবাদ জানায়।
ইরাকের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় বলেছে, ২০২৫ সাল হতে চলেছে ১৯৩৩ সালের পর থেকে সবচেয়ে শুষ্ক বছর। বর্তমানে দেশের জলাধারগুলোতে পানির মজুত পূর্ণ ক্ষমতার মাত্র ৮ শতাংশে নেমে এসেছে।
নতুন “মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশ আইন” প্রথম পঠিত হয় ২০২২ সালের ৩ ডিসেম্বর এবং দ্বিতীয় পঠিত হয় ২০২৩ সালের ৯ মে। তখন মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবাদের মুখে ৩১ জুলাই সংসদ জানিয়েছিল, খসড়ায় থাকা ‘মতপ্রকাশ সংক্রান্ত’ ধারা বাদ দেওয়া হয়েছে যাতে প্রতিবাদে বাধা না আসে। কিন্তু বাস্তবে কী পরিবর্তন আনা হয়েছে—তা এখনো স্পষ্ট নয়। সিভিল সোসাইটির সঙ্গে কোনো পরামর্শ হয়নি।
হাম্মুরাবি হিউম্যান রাইটস অর্গানাইজেশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা উইলিয়াম ওয়ার্ডা বলেন,
“এই আইন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী নয়। তথ্য ছাড়া আমরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কিছু বলতে পারি না।”
তিনি আরও বলেন,
“গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শুধু সরকার নয়, রাজনৈতিক দল, কোম্পানি এবং এনজিওকেও স্বচ্ছতার আওতায় আনতে হবে। ভবিষ্যতের জন প্রতিনিধি কিংবা প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনতে এটা প্রয়োজন।”
সংসদীয় সূত্র বলছে, আইনটি ইরাকের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে এবং এতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নিষিদ্ধ করা হয়নি।
তবে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, আইনের ভাষা ও বাস্তব প্রয়োগে যে ফাঁকফোকর রয়েছে, তা সরকারের সমালোচকদের দমন করার জন্য সহজ অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।


1 Comment
Erek desher jonosomabes kmon