আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রে। যুদ্ধ শুরুর প্রায় তিন বছর পরও সংঘাতের কোনো স্পষ্ট সমাধান দেখা যাচ্ছে না। এর মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে আলাস্কায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব উঠে এসেছে। আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পূর্ব ইউক্রেনের শিল্পাঞ্চল দনবাস—যা কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন জাগছে: কেন এই অঞ্চলটিকে কেন্দ্র করে পুতিন এতটা মরিয়া? কেন তিনি পুরো যুদ্ধটিকে প্রায় দনবাসকেন্দ্রিক করে তুলেছেন?
দনবাস: ইতিহাস ও ভূ-রাজনীতির সংক্ষিপ্ত পটভূমি-
দনবাস অঞ্চল মূলত দুটি প্রশাসনিক অঞ্চল—দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক—নিয়ে গঠিত। সোভিয়েত আমল থেকে এটি ইউক্রেনের শিল্প–হৃদয়ভূমি হিসেবে পরিচিত। বিশাল কয়লা খনি, ইস্পাত কারখানা, ভারী শিল্প ও প্রতিরক্ষা–সম্পর্কিত উৎপাদনকেন্দ্র এ অঞ্চলের অর্থনীতির মেরুদণ্ড গড়ে তুলেছিল।
২০ শতকের শুরু থেকেই এ অঞ্চল নিয়ে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। বলশেভিক বিপ্লব-পরবর্তী বিশৃঙ্খলার সময়ে ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদী, কমিউনিস্ট ও রুশ রাজতন্ত্রীদের মধ্যে দনবাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রক্তক্ষয়ী লড়াই হয়। পরবর্তী সময়ে স্তালিনের শিল্পায়ন নীতির কারণে বিপুল সংখ্যক রুশ শ্রমিক এখানে অভিবাসন করে আসে। এর ফলে স্থানীয় জনসংখ্যার ভাষা ও সাংস্কৃতিক ভারসাম্য বদলে যায়—রুশভাষী মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙনের সময় দনবাসের প্রায় দুই–তৃতীয়াংশ বাসিন্দা রুশ ভাষাকে তাদের মাতৃভাষা হিসেবে দাবি করেছিল। এ থেকেই বোঝা যায়, মস্কোর সঙ্গে এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক যোগসূত্র কতটা গভীর ছিল।

২০১৪: দনবাস সংঘাতের সূচনা-
২০১০ সালে দনবাসবাসীরা ব্যাপক হারে রুশপন্থি প্রার্থী ভিক্টর ইয়ানুকোভিচকে ভোট দিয়েছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে কিয়েভে ‘ইউরোমাইদান’ আন্দোলনের মাধ্যমে ইয়ানুকোভিচ ক্ষমতাচ্যুত হলে পুতিন এটিকে পশ্চিমা ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দেন। একই বছর রাশিয়া ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করে নেয় এবং দনবাসে বিচ্ছিন্নতাবাদ উসকে দেয়। রুশ আর্থিক ও সামরিক সহায়তায় দোনেৎস্ক ও লুহানস্কে ‘জনগণ প্রজাতন্ত্র’ ঘোষণা করা হয়। ইউক্রেনীয় সেনা ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়।
এভাবেই দনবাস ধীরে ধীরে রাশিয়া–ইউক্রেন সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হয়।
২০২২: পূর্ণমাত্রার আক্রমণ ও দনবাসের দখল অভিযান-
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুতিন পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করেন। তাঁর ভাষ্য ছিল—“ডনবাসের রুশপন্থি জনগণকে রক্ষা করা”। এরপর মস্কো দ্রুত একাধিক অঞ্চলে ‘গণভোট’ আয়োজন করে, যার মাধ্যমে দোনেৎস্ক ও লুহানস্কসহ চারটি ইউক্রেনীয় অঞ্চলকে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত ঘোষণা করা হয়।
তবে বাস্তবে রাশিয়ার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে কেবল লুহানস্কে। দোনেৎস্কের বড় অংশ এখনো ইউক্রেনের দখলে। ইউক্রেনীয় সূত্রে জানা যায়, এখনো প্রায় ২,৬০০ বর্গমাইল এলাকা কিয়েভ সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেখানে ২ লাখেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক বাস করছে। এই অঞ্চলের বড় শহর স্লোভিয়ানস্ক ও ক্রামাতোরস্কই দনবাস যুদ্ধের কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছে।
পুতিনের বর্তমান শান্তি প্রস্তাব-
আলাস্কায় ট্রাম্প–পুতিন বৈঠক থেকে যে প্রস্তাব এসেছে, তার মূলে রয়েছে ইউক্রেনকে দনবাস থেকে সেনা সরিয়ে নিতে বাধ্য করা। এর বিনিময়ে রাশিয়া ইউক্রেনের অন্যান্য এলাকায় যুদ্ধ বন্ধ করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। তবে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ইতোমধ্যেই স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি দনবাস ছাড়বেন না। তাঁর ভাষায়—“আমরা দনবাস ছাড়ব না। আমরা তা করতে পারি না।”
এই অবস্থান ইউক্রেনের জন্য যেমন নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বাস্তব দিক থেকেও কৌশলগত। কারণ দনবাস ছেড়ে দেওয়া মানে কেবল একটি অঞ্চল হারানো নয়; বরং এটি ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার জন্য মারাত্মক দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াবে।

পুতিনের মরিয়া চেষ্টার কারণ কী?
১. ভূরাজনৈতিক অবস্থান: দনবাস রাশিয়ার সীমান্ত ঘেঁষা। এ অঞ্চল দখল মানে পশ্চিম সীমান্তে একটি ‘বাফার জোন’ তৈরি করা। ইউক্রেন যদি ন্যাটোতে যোগ দেয়, তবে দনবাস রাশিয়ার জন্য একটি প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল হিসেবে কাজ করবে।
২. অর্থনৈতিক ও শিল্প গুরুত্ব: দনবাস ইউক্রেনের শিল্প উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র। কয়লা, ইস্পাত ও ভারী শিল্প এখানে কেন্দ্রীভূত। এ অঞ্চল দখল করলে রাশিয়া কেবল কৌশলগত সুবিধাই নয়, বিশাল অর্থনৈতিক সম্পদও লাভ করবে।
৩. রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি: ২০১৪ সাল থেকে পুতিন দনবাসের রুশপন্থি জনগণকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন। রাশিয়ার অভ্যন্তরে জাতীয়তাবাদী জনমতকে ধরে রাখতে হলে তাঁকে এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতেই হবে। ক্রেমলিন–ঘনিষ্ঠ সম্পাদক কন্সট্যান্টিন রেমচুকভের ভাষায়, “দনবাসের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া পুতিন ‘মিশন সম্পন্ন’ ঘোষণা করতে পারবেন না।”
৪. জাতিগত ও ভাষাগত প্রভাব: রুশ ভাষাভাষীর আধিক্য এবং রাশিয়াপন্থি রাজনৈতিক অভিমুখের কারণে দনবাসকে মস্কো ‘স্বাভাবিকভাবে নিজেদের অংশ’ হিসেবে দেখে। সাবেক উপদেষ্টা সের্গেই মার্কভ যেমন বলেছেন, “নিপ্রো, সুমি বা খারকিভ নয়—দোনেৎস্কই আমাদের কাছে বেশি ‘নিজেদের’।’’
যুদ্ধের মানবিক মূল্য-
২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দনবাসে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, প্রাণ হারিয়েছেন অনেকে। জাতিসংঘের হিসাবে, কয়েক হাজার বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। চলমান সংঘাতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্র পর্যবেক্ষক সংস্থা ডিপস্টেট জানিয়েছে, রাশিয়া ইতোমধ্যেই দনবাসের ৮৭ শতাংশ দখল করেছে এবং ধীরে ধীরে অবশিষ্ট অংশও দখল করছে।
যদি যুদ্ধবিরতি না হয়, তাহলে বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, এই সংঘাত আরও এক বছর গড়াবে। তাতে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে।
পুতিন কি দনবাসেই থামবেন?
এ প্রশ্ন আজ বিশ্ববাসীর। পুতিন যদিও দনবাসকে যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু বানিয়েছেন, তবুও তিনি একাধিকবার ইঙ্গিত দিয়েছেন ইউক্রেনের আরও অঞ্চল দখল করার। খেরসন, জাপোরিঝঝিয়া এমনকি রাজধানী কিয়েভ পর্যন্ত তাঁর কৌশলগত লক্ষ্য হতে পারে বলে অনেক পশ্চিমা বিশ্লেষক মনে করেন।
তবে বাস্তবতা হলো, রাশিয়ার অর্থনীতি দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে নেওয়ার মতো সক্ষমতায় নেই। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, তেলের আয়ের পতন এবং সামরিক ব্যয়ের চাপ রাশিয়াকে দুর্বল করে তুলছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই সীমাবদ্ধতার কারণে পুতিন হয়তো অন্তত সাময়িকভাবে দনবাস দখলেই সন্তুষ্ট হতে বাধ্য হবেন।

ইউক্রেনের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ-
জেলেনস্কি বারবার বলেছেন, তিনি কোনো ভূখণ্ড ছাড়বেন না। তাঁর কাছে দনবাস কেবল একটি অঞ্চল নয়, বরং ইউক্রেনের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। তবে পশ্চিমা সমর্থন ছাড়া ইউক্রেনের পক্ষে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালানো কঠিন। মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পরিবর্তন, ইউরোপীয় দেশগুলোর ক্লান্তি—সব মিলিয়ে কিয়েভের অবস্থানও চাপের মধ্যে।
পরিশেষে, দনবাসকে ঘিরে রাশিয়া–ইউক্রেন সংঘাত কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়; এটি বিশ্বব্যবস্থার শক্তি–সাম্যের প্রশ্ন। পুতিন দনবাসকে ‘নিজেদের ভূখণ্ড’ হিসেবে দাবি করে রাশিয়ার জাতীয়তাবাদকে উসকে দিচ্ছেন। অন্যদিকে ইউক্রেন এটিকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার লড়াইয়ের কেন্দ্রে দেখছে।
দনবাসের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে ইউক্রেন যুদ্ধের গতিপথ। পুতিন হয়তো আপাতত এ অঞ্চল নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবেন, কিন্তু ইতিহাস বলছে—আক্রমণকারী একবার যদি সাফল্যের স্বাদ পায়, তবে তার থেমে যাওয়া খুবই কঠিন। বিশ্ব তাই আজ দনবাসের দিকে তাকিয়ে আছে, কারণ এর ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে সমগ্র ইউরোপের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ভারসাম্য।

