চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং বিশ্বকে সতর্ক করেছেন। তাঁর ভাষায়, মানবসভ্যতা এখন শান্তি না যুদ্ধ—এই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে।
বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক তিয়েনানমেন স্কয়ারে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের ৮০ বছর উপলক্ষে আয়োজিত সামরিক কুচকাওয়াজে এই বার্তা দেন তিনি। এটি ছিল চীনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সামরিক প্যারেড। এ সময় তাঁর দুপাশে ছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন।
এই বর্ণাঢ্য আয়োজনে পশ্চিমা বিশ্বের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন না। বরং ইউক্রেন যুদ্ধ ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিতর্কে থাকা পুতিন ও কিম বিশেষ অতিথি হিসেবে মঞ্চে ছিলেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি ছিল চীনের সামরিক শক্তি ও কূটনৈতিক প্রভাব প্রদর্শনের স্পষ্ট প্রচেষ্টা।
সি ৫০ হাজার দর্শকের উদ্দেশে বলেন, মানবজাতি আজ এক মোড় ঘোরানো মুহূর্তে দাঁড়িয়ে। শান্তি না যুদ্ধ, সংলাপ না সংঘাত—এখন সেটিই মূল প্রশ্ন। তাঁর দাবি, চীনা জনগণ সবসময় ইতিহাসের সঠিক পাশে রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে তিনি উল্লেখ করেন চীনের “মহাজাগরণের সূচনা” হিসেবে।
এর আগে সপ্তাহের শুরুতে এক আঞ্চলিক নিরাপত্তা সম্মেলনে সি নতুন বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন। সেখানে তিনি আহ্বান জানান, বিশ্বকে এক হয়ে ‘আধিপত্যবাদ ও শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতি’র বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি আসলে যুক্তরাষ্ট্র ও ট্রাম্পের শুল্কনীতির বিরুদ্ধেই ইঙ্গিত।
প্যারেড শুরু হতেই যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের কবল থেকে চীনকে মুক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল মুখ্য। ব্যঙ্গ করে তিনি আরও লেখেন, “পুতিন আর কিমকে আমার শুভেচ্ছা দিও, যেহেতু তোমরা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছ।”
তবে সাংবাদিকদের কাছে ট্রাম্প বলেন, তিনি এই প্যারেডকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো চ্যালেঞ্জ মনে করেন না এবং তাঁর সঙ্গে সি’র সম্পর্ক এখনও “খুব ভালো”।
রাশিয়া–চীন–উত্তর কোরিয়ার কৌশলগত বার্তা
এই আয়োজনেই পুতিন চীনের সঙ্গে নতুন জ্বালানি চুক্তি পাকাপোক্ত করেন। কিমের জন্য এটি ছিল পারমাণবিক কর্মসূচিতে পরোক্ষ সমর্থন আদায়ের সুযোগ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ৬৬ বছর পর প্রথমবার কোনো উত্তর কোরীয় নেতা চীনের সামরিক কুচকাওয়াজে অংশ নিলেন। এখানেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আত্মপ্রকাশ করলেন কিমের কন্যা জু আয়ে, যাকে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দারা তাঁর সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, রাশিয়া, চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার হলে এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। গত জুনে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে চুক্তি হয়েছে। চীন–পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গেও অনুরূপ আলোচনার ইঙ্গিত মিলছে।
এই ঐতিহাসিক সমাবেশকে ঘিরে বেইজিংয়ে ছিল কঠোর নিরাপত্তা। প্রধান সড়ক ও স্কুল বন্ধ রাখা হয়। টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে গভীর রাত পর্যন্ত মহড়া চলে। দেশজুড়ে হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক ও কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য মোতায়েন ছিল যেকোনো অশান্তি ঠেকাতে।
অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের গ্লোবাল চায়না হাবের ফেলো ওয়েন-টি সুং বলেন, “প্রেসিডেন্ট সি এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেখাতে চাইছেন, সেনাবাহিনী পুরোপুরি তাঁর পাশে রয়েছে।”

