ইন্দোনেশিয়ায় ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা ৬৬১ ছাড়িয়েছে, আর নিখোঁজ রয়েছেন আরো অন্তত ৫০০ জন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রদেশগুলোতে উদ্ধারকর্মীরা টানা প্রচেষ্টা চালালেও চরম দুর্ভোগের মুখে পড়ছেন তারা। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানায়, মালাক্কা প্রণালিতে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে তিনটি প্রদেশে ব্যাপক বন্যা দেখা দিয়েছে, এতে অন্তত ১৪ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আচেহ, উত্তর সুমাত্রা এবং পশ্চিম সুমাত্রা—এই তিন প্রদেশে বন্যার প্রভাব সবচেয়ে ভয়াবহ। হাজারো মানুষ এখন খাদ্য ও জরুরি সরঞ্জাম ছাড়া বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছেন এবং আটকে পড়া অঞ্চলে পৌঁছাতে পারছেন না সহায়তাকর্মীরা। আচেহর পিদিয় জয়ার বাসিন্দা আরিনি আমালিয়া বলেন, পানি যেন সুনামির মতো এসে গ্রাম তছনছ করে দিয়েছে। তার দাদির মতে, এটি জীবনে দেখা সবচেয়ে বড় দুর্যোগ।
বন্যার তোড়ে বহু সেতু ভেঙে গেছে, ভূমিধসে বন্ধ হয়ে পড়েছে একাধিক সড়ক। ফলে বড় যানবাহন চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়ায় উদ্ধারকর্মীদের হাঁটা বা মোটরসাইকেলে করে দুর্গত এলাকায় পৌঁছাতে হচ্ছে। বহু অঞ্চলে খাদ্যসামগ্রী এখনো পৌঁছায়নি। পশ্চিম সুমাত্রার বিখ্যাত টুইন ব্রিজ এলাকায় জমে থাকা মাটি–কাদার স্তূপ সরাতে প্রশাসন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সেই এলাকায় নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে অপেক্ষা করছিলেন মারিয়ানা। তিনি বলেন, খননযন্ত্রে কাদা সরানোর মুহূর্তে মনে হয়—তার ছেলে কী অবস্থায় আছে এবং তাকে আদৌ চিনতে পারবেন কিনা।
উত্তর সুমাত্রার সেন্ট্রাল তাপানুলির বাসিন্দা মাইসান্তি জানান, তিন দিন ধরে তাদের কাছে কোনো খাবার নেই। তার ভাষায়, পরিস্থিতি এমন যে ইনস্ট্যান্ট নুডলস নিয়েও ঝগড়া হচ্ছে। তিনি বলেন, তারা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন—খাবার নেই, পানি নেই। অনেক এলাকায় ইন্টারনেট ও ফোনসেবা বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে, ফলে মানুষ কয়েক কিলোমিটার হেঁটে নেটওয়ার্কের সিগন্যাল খুঁজছেন। সেন্ট্রাল আচেহতে রোববার রাতে হাজারো মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে স্টারলিংক ডিভাইস দিয়ে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন।
উদ্ধারকাজ চললেও সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। অনেকেই অভিযোগ করছেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে খাদ্য সহায়তা বিলম্বিত হয়েছে। সোমবার উত্তর সুমাত্রার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো স্বীকার করেন, বহু রাস্তা এখনো বিচ্ছিন্ন। তবে তার দাবি, সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে এবং দেশ সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম।
শুধু ইন্দোনেশিয়াই নয়, গত এক সপ্তাহে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও শ্রীলংকাসহ এশিয়ার একাধিক দেশে বন্যা ও ভূমিধসে প্রায় ১১০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। শ্রীলংকায় ৩৫৫ জন এবং থাইল্যান্ডে ১৭৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
বিবিসি ওয়েদার জানায়, এটি একক কোনো দুর্যোগ নয়—উত্তর–পূর্ব মৌসুমী বায়ু, ঘূর্ণিঝড় এবং অতিরিক্ত আর্দ্রতার সম্মিলিত প্রভাবেই বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পেয়েছে। শ্রীলঙ্কায় বৃষ্টিপাত বাড়িয়েছে ঘূর্ণিঝড় দিতওয়া, আর মালয় উপদ্বীপ–সুমাত্রা অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় সেনিয়ার প্রভাবে এক মিটারের বেশি বৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষুবরেখার এত কাছাকাছি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক। ভিয়েতনামেও কয়েক সপ্তাহ ধরে অতিবৃষ্টি চলমান রয়েছে এবং টাইফুন কোটোর প্রভাবে আরও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

