সিএনএনের বিশ্লেষণ—
সপ্তাহান্তে এক ‘সফল অভিযানের’ মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ভেনেজুয়েলায় চালানো ওই অভিযানে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ধরে তুলে নিয়ে গেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এ অভিযান এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিগত পদক্ষেপ। এতে বোঝা যাচ্ছে, বৈশ্বিক অঙ্গনে, বিশেষ করে পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ও প্রভাব আরো জোরালোভাবে ব্যবহারের পথে হাঁটছেন তিনি।
ইতিমধ্যে ট্রাম্প আরো বেশ কিছু দেশকে হুমকি দিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, দেশগুলো তাঁর পরবর্তী নিশানা হতে পারে।
ভেনেজুয়েলায় এ অভিযানের রাজনৈতিক প্রভাব আসলে কী? প্রাথমিকভাবে যা বোঝা যাচ্ছে, তা তুলে ধরা হলো:
ভেনেজুয়েলা অভিযানের ওপর প্রথম মানসম্মত জনমত জরিপটি গতকাল সোমবার প্রকাশ করেছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট। জরিপ বলছে, রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু এর মানে এই নয় যে অভিযানটি জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
জরিপ অনুযায়ী, ৪০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মাদুরোকে তুলে আনতে সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। বিপরীতে ৪২ শতাংশ বিরোধিতা করেছেন।
অর্থাৎ জনমত প্রায় সমানভাবে বিভক্ত। তবে এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে।
প্রথমত, এসব সংখ্যা প্রত্যাশার চেয়ে ভালো। অভিযানের আগে করা জরিপগুলোয় দেখা গিয়েছিল, ভেনেজুয়েলায় সামরিক পদক্ষেপের বিপক্ষে বিপুলসংখ্যক মার্কিন নাগরিক। কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপে ৬৩ শতাংশ বনাম ২৫ শতাংশ এবং সিবিএস নিউজ–ইউগভ জরিপে ৭০ শতাংশ বনাম ৩০ শতাংশ মানুষ সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে–বিপক্ষে অবস্থান করছিলেন।
অবাধ্য কোনো বিদেশি নেতাকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেয়ে বড় শক্তির নিদর্শন আর হতে পারে না। এ ঘটনা নিশ্চিতভাবেই অন্য বিশ্বনেতাদের কাছে একটি কড়া বার্তা দেবে।
নিক পেটন ওয়ালশ, সিএনএনের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা–বিষয়ক সম্পাদক
একটি সম্ভাব্য কারণ, এ অভিযান এখনো পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন নয়। অন্তত এই মুহূর্তে। ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার বাকি নেতৃত্ব তাঁর কথা না মানলে ‘দ্বিতীয় হামলা’সহ অভিযান আরও বিস্তৃত হতে পারে।
অনেকের কাছেই শুধু মাদুরোকে ধরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে। কারণ, তিনি একজন সহানুভূতিহীন ও কঠোর শাসক হিসেবে পরিচিত।

আরেকটি কারণ হতে পারে দলীয় রাজনীতি। গত বছরের মাঝামাঝি ইরানে ট্রাম্পের হামলার পর দেখা গিয়েছিল, অনেক রিপাবলিকান শুরুতে সন্দিহান থাকলেও হামলার পর শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন।
ভেনেজুয়েলা অভিযানের আগে কুইনিপিয়াক ও সিবিএসের জরিপে যথাক্রমে ৫২ ও ৫৮ শতাংশ রিপাবলিকান সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু হামলার পর ওয়াশিংটন পোস্টের জরিপে এ হার বেড়ে দাঁড়ায় ৭৪ শতাংশে।
স্বতন্ত্র বা নির্দলীয় ভোটারদের মধ্যে পরিবর্তন তুলনামূলক কম। অভিযানের আগে তাঁদের মধ্যে ১৯ থেকে ২২ শতাংশ সামরিক পদক্ষেপ সমর্থন করেছিলেন। পরে তা বেড়ে ৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এ ধরনের অভিযানের শুরুতেই জনপ্রিয়তায় ঘাটতি হওয়ার বিষয়টি সাধারণত দেখা যায় না।
মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার এ অভিযানের সঙ্গে ১৯৮৯–৯০ সালে পানামার তৎকালীন শাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে ধরার অভিযানের অনেক মিল রয়েছে। কিন্তু তখন ওয়াশিংটন পোস্টের জরিপে দেখা গিয়েছিল, ১০ জনের মধ্যে ৮ মার্কিন নাগরিক সেই অভিযান সমর্থন করেছিলেন।
১৯৮৩ সালে গ্রেনাডা আগ্রাসন এবং ২০০১ সালে আফগানিস্তান ও ২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসনের ক্ষেত্রেও শুরুতে ব্যাপক জনসমর্থন ছিল।
সাধারণত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি জটিল হলে এসব অভিযানের জনপ্রিয়তা কমে। কিন্তু শুরুতে মার্কিনরা সাধারণত পাশে থাকেন। সেদিক থেকে দেখতে গেলে, দ্রুত শেষ হওয়া, সফল এবং কোনো মার্কিন সেনার প্রাণহানি না হওয়া সত্ত্বেও এ অভিযানের জনপ্রিয়তা মাঝামাঝি পর্যায়ে থাকা ট্রাম্পের জন্য শুভ লক্ষণ নয়।
এর ওপর ভেনেজুয়েলা শাসন করা ও দেশটির তেলের মজুত নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ অত্যন্ত বিতর্কিত। এটিও ভবিষ্যতে তাঁর জনপ্রিয়তায় আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মার্কিনরা যে শুধু ভেনেজুয়েলা অভিযান নিয়ে সন্দিহান, তা–ই নয়; বরং ট্রাম্প তাঁর পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে যতটা আগ্রহী, তাঁরা তত আগ্রহী নন। তাঁরা চান, প্রেসিডেন্ট যেন বিদেশের বদলে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়, যেমন মূল্যস্ফীতির দিকে বেশি নজর দেন।
বিষয়টির সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া গেছে কয়েক মাস আগে। ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি করে ট্রাম্প যখন বড় ধরনের কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, তখন সাধারণ মার্কিনরা তাতে খুব একটা গা করেননি। জনমত জরিপে দেখা গেছে, গাজা ইস্যুতে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তখনো ছিল নিম্নমুখী।

বিদেশের ব্যাপারে মার্কিনদের এ অনাগ্রহের প্রমাণ আরও আছে। শিকাগো কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, প্রায় ৪০ শতাংশ মার্কিন চান, যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের বিষয়ে ‘নাক না গলিয়ে’ চলুক। কয়েক দশকের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ এবং এর মধ্যে ৪০ শতাংশ রিপাবলিকানও রয়েছেন।
গত জুন মাসে রয়টার্স-ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, রিপাবলিকান, ডেমোক্র্যাট ও স্বতন্ত্র—সব পক্ষেরই সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার মনে করেন, অন্যের বিষয়ে মাথা না ঘামালে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই ভালো হবে।
সম্প্রতি, ২০২৬ সালে, যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের বিষয়ে এপি-এনওআরসি একটি জরিপ চালায়। সেখানে মাত্র ২৬ শতাংশ মানুষ পররাষ্ট্রনীতির কথা বলেছেন। তালিকার সবচেয়ে নিচে থাকা এ বিষয়ের তুলনায় অর্থনীতি (৭১%), অভিবাসন (৪৪%), স্বাস্থ্যসেবা (৪১%) ও ব্যক্তিগত আর্থিক সমস্যা (৪৩%) অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের নতুন জরিপেও এ বিষয়ের প্রতিফলন দেখা গেছে। ভেনেজুয়েলা অভিযানে তিন-চতুর্থাংশ রিপাবলিকান সমর্থন দিলেও ‘দৃঢ়ভাবে’ সমর্থন দিয়েছেন মাত্র ৪৫ শতাংশ। ইরানে হামলার পর সিএনএনের জরিপেও একই চিত্র দেখা যায়। ৮২ শতাংশ রিপাবলিকান সমর্থন দিলেও দৃঢ় সমর্থন ছিল মাত্র ৪৪ শতাংশের।
ট্রাম্পের কট্টর সমর্থকেরাই যদি এসব হামলায় খুব বেশি উত্তেজিত না হন, তবে একে একটি সংকেত হিসেবে ধরা যায়। ট্রাম্প হয়তো পশ্চিম গোলার্ধে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং নোবেল শান্তি পুরস্কারের পেছনে ছুটছেন। কিন্তু সাধারণ মার্কিন কিংবা রিপাবলিকানদের কাছে এখন এগুলো অগ্রাধিকার নয়।
জনমত শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবে, তা এখনো দেখার বিষয়। তবে বাস্তব ক্ষেত্রে ট্রাম্প তাঁর সামরিক মনোভাবাপন্ন ও বিদেশমুখী দ্বিতীয় মেয়াদে যা চেয়েছিলেন, তা পেতে শুরু করেছেন। দৃশ্যত তিনি তাঁর কাঙ্ক্ষিত সেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার গড়ে তুলছেন।
গত সপ্তাহান্তে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘ডনরো ডকট্রিন’ নিয়ে তাঁর মন্তব্য ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল—সবকিছুতে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে হুমকি, জবরদস্তি, এমনকি সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পশ্চিম গোলার্ধে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করাই তাঁর লক্ষ্য।
গত শনিবার ‘ট্রাম্প ওয়ার রুম’ নামের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টের একটি ছবি বিষয়টি আরও পরিষ্কার করে দিয়েছে। সেখানে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার মানচিত্রের ওপর ট্রাম্পকে এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, যেখানে তাঁর হাতে থাকা বেসবল ব্যাটে লেখা ছিল ‘ডনরো ডকট্রিন’।
মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে নিজের ইচ্ছেমতো পরিচালিত করতে ট্রাম্প সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন। সিএনএনের নিক পেটন ওয়ালশ গত সপ্তাহান্তে লিখেছেন, অবাধ্য কোনো বিদেশি নেতাকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেয়ে বড় শক্তির নিদর্শন আর হতে পারে না। এ ঘটনা নিশ্চিতভাবেই অন্য বিশ্বনেতাদের কাছে একটি কড়া বার্তা দেবে।
ভেনেজুয়েলায় এখনো অনেক কিছু ঘটা বাকি। ইতিহাস বলে, সেখানকার পরিস্থিতি খুব দ্রুতই ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে ট্রাম্পের বৃহত্তর বিদেশি প্রচারণার পটভূমিতে এটি ছিল শক্তির এক বিশাল প্রদর্শনী, যা তাঁর পরবর্তী প্রকল্পগুলো এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।

ভেনেজুয়েলায় এ হামলার কারণে ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক গোষ্ঠী বা ঘাঁটি তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে—এমনটা মনে না হলেও এটি ‘মাগা’ (মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন) আন্দোলনের ভেতরের ফাটলকে আরও বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ট্রাম্প কার্যত তাঁর দলের ‘হস্তক্ষেপবিরোধী’ (যাঁরা অন্য দেশের বিষয়ে নাক গলানোর বিরোধী) অংশকে তাঁকে ছেড়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। ইরানে হামলার পর এ অংশ মূলত চোখ বুজে ছিল। কিন্তু ট্রাম্প যখন একজন বিদেশি নেতাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছেন এবং কলম্বিয়া, কিউবা, গ্রিনল্যান্ড, ইরান ও মেক্সিকোকে হুমকি দিচ্ছেন, তখন তাঁরা কী করবেন?
এখন পর্যন্ত খুব কম মানুষই এ নিয়ে মুখ খুলেছেন এবং ট্রাম্পের ‘মাগা’ মিত্রদের অধিকাংশকেই তাঁর পাশে দেখা যাচ্ছে। তবে ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের সমালোচক কেনটাকির প্রতিনিধি টমাস ম্যাসি এবং বিদায়ী প্রতিনিধি মার্জরি টেলর গ্রিন কড়া সমালোচনা করেছেন। এ ছাড়া কেনটাকির সিনেটর র্যান্ড পল, আলাস্কার লিসা মুরকোস্কি, ড্যান সুলিভানসহ আরও অনেকে এ অভিযান পরিচালনা ও এর পরবর্তী প্রভাব নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
‘মাগা’ প্রভাবিত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে ক্যান্ডেস ওয়েন্স এ হামলাকে বিশ্বায়নবাদীদের ‘শত্রুতামূলক দখলদারত্ব’ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। অন্যদিকে স্টিভ ব্যানন প্রশ্ন তুলেছেন, ট্রাম্প ‘নিওকন’ বা নব্য রক্ষণশীলদের প্ররোচনায় এ কাজ করছেন কি না।
একপর্যায়ে এসব মানুষকে ভাবতেই হবে, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নিয়ে ট্রাম্পের ধারণা কি তাঁদের ধারণা থেকে একেবারেই আলাদা হয়ে গেছে? আর ইরানের মতো বিষয়ে ট্রাম্পকে ছাড় দেওয়া কি তাঁকে ভেনেজুয়েলার মতো জায়গায় আরও এগোতে সাহসী করে তুলেছে?
বিষয়টি আরও জটিল হবে, যদি ট্রাম্প সত্যিই ভেনেজুয়েলা শাসন করা এবং দেশটির তেল কবজা করার বিষয়ে অনড় থাকেন। চলতি সপ্তাহান্তে যে রিপাবলিকানরা এ হামলার প্রশংসা করেছেন, তাঁদের অনেকেই ট্রাম্পকে এমন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। ট্রাম্প বুঝতে না পারলেও তাঁরা হয়তো সামনে বড় কোনো বিপদের আভাস পাচ্ছেন।

