মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে তাঁর সিদ্ধান্তে একমাত্র নিয়ন্ত্রণ হলো নিজের নৈতিকতা ও বিবেক। আন্তর্জাতিক আইনসহ কোনো বিধিনিষেধকে তিনি সামরিক শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক মনে করেন না। বিভিন্ন দেশে হামলা, আগ্রাসন বা চাপ প্রয়োগের প্রশ্নে এই অবস্থানই তাঁর নীতির ভিত্তি।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়, বৈশ্বিক ক্ষমতার ওপর তাঁর কোনো সীমা আছে কি না। জবাবে তিনি বলেন, আছে মাত্র একটি। তাঁর নিজের নৈতিকতা ও বিবেক। তাঁর ভাষায়, সেটিই কেবল তাঁকে থামাতে পারে। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজন তাঁর নেই। তবে তিনি মানুষকে ক্ষতি করতে চান না।
এরপর তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, তাঁর প্রশাসন কি আন্তর্জাতিক আইন মানতে বাধ্য? ট্রাম্প বলেন, হ্যাঁ, মানতে হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সেই আইন কতটা প্রযোজ্য হবে, তা তিনি নিজেই নির্ধারণ করবেন। তাঁর মতে, এখানে আন্তর্জাতিক আইনের সংজ্ঞা কীভাবে দেওয়া হচ্ছে, সেটাই মূল বিষয়।
সামরিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক শক্তি প্রয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য নিশ্চিত করার বিষয়ে এটি ট্রাম্পের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্পষ্ট স্বীকারোক্তি। তাঁর দৃষ্টিতে শক্তির সংঘর্ষে আইন, চুক্তি বা কনভেনশনের চেয়ে জাতীয় শক্তিই চূড়ান্ত নির্ধারক হওয়া উচিত।
এই প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলার পর কলম্বিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাতে পারে—এমন হুমকিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন দেশটির প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো। ট্রাম্প যখন নিউইয়র্ক টাইমসকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন, তখন পেত্রো তাঁকে ফোনও করেন। তবে সেই কথোপকথনের বিষয়বস্তু সাংবাদিকদের জানানো হয়নি।
সাক্ষাৎকারজুড়ে ট্রাম্পকে আত্মবিশ্বাসী দেখা গেছে। তিনি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার সাফল্যের কথা তুলে ধরেন। বলেন, ওই অভিযানে ব্যবহৃত বি-২ বোমারু বিমানের একটি মডেল তিনি সবসময় নিজের ডেস্কে রাখেন। আলোচনায় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টের প্রসঙ্গের পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তাঁর পরিকল্পনার কথাও উঠে আসে।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, চীন ও রাশিয়ার নৌ-তৎপরতার এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। এই ভূখণ্ড দখলের চেষ্টা ন্যাটোর ভেতরে বিভাজন তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ গ্রিনল্যান্ড বর্তমানে ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণে এবং ডেনমার্ক ন্যাটোর সদস্য। এ বিষয়ে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হলে তিনি সরাসরি উত্তর দেননি। তবে বলেন, যেকোনো একটিকে বেছে নিতেই হবে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব না থাকলে ন্যাটোর কোনো মূল্য নেই।
আন্তর্জাতিক নিয়ম মানার প্রয়োজন নেই—এমন যুক্তি দেখিয়ে চীন বা রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতি করতে পারবে বলে তিনি মনে করেন না। ট্রাম্প বলেন, তাঁর চোখে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিই চূড়ান্ত। আগের প্রেসিডেন্টরা রাজনৈতিক আধিপত্য বা জাতীয় স্বার্থ আদায়ে এই শক্তি ব্যবহারে অতিরিক্ত সতর্ক ছিলেন।
গ্রিনল্যান্ডের মতো ভূখণ্ডের মালিকানা কেন প্রয়োজন—এই প্রশ্নে ট্রাম্প বলেন, সাফল্যের জন্য এটি মানসিকভাবে জরুরি। তাঁর মতে, মালিকানা এমন সুবিধা দেয়, যা ইজারা বা চুক্তির মাধ্যমে পাওয়া যায় না। শুধু নথিতে স্বাক্ষর করে যে সুবিধা মেলে না, মালিকানা থাকলে তা সম্ভব হয়।
নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই কথোপকথন থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট। ট্রাম্পের কাছে সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় সীমানার গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে কম। তাঁর দৃষ্টিতে পশ্চিমা বিশ্বের রক্ষক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের একক ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়।

