দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করলেও সিরিয়ার সামনে এখন এক গভীর অস্তিত্বগত প্রশ্ন—দেশটি কি সত্যিই আবার একক রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়াতে পারবে? সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বলছে, দামেস্কের নিয়ন্ত্রণ এখনও নড়বড়ে, আর সেই দুর্বলতাকে ঘিরেই মাথাচাড়া দিচ্ছে অস্থিরতা, অবিশ্বাস ও বিদেশি প্রভাব।
সম্প্রতি ফাঁস হওয়া কিছু অডিও রেকর্ড ও নথি সিরিয়ার আলাওয়ি-অধ্যুষিত উপকূলীয় অঞ্চলে একটি সশস্ত্র বিদ্রোহের ছক উন্মোচন করেছে। এসব পরিকল্পনার পেছনে রয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারের উচ্চপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা, যারা এখন নির্বাসনে আছেন। নথিগুলোতে দেখা যায়, আলাওয়ি সম্প্রদায়ের ভেতর থেকে যোদ্ধা সংগ্রহ, অস্ত্র মজুত ও চলাচল, এমনকি যোদ্ধাদের পরিবারের কাছে অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
এই ফাঁস হওয়া তথ্যগুলো এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন মাত্র কয়েক মাস আগেই—মার্চে—উপকূলীয় অঞ্চলে একটি বিদ্রোহ ভয়াবহ রূপ নেয়। ওই ঘটনায় এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হন, যাদের মধ্যে ছিলেন বেসামরিক নাগরিক, সরকারি সেনা ও আলাওয়ি যোদ্ধারা। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার আগেই জুলাইয়ে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে দক্ষিণের দ্রুজ অধ্যুষিত সুয়াইদা প্রদেশে। সেখানে সুন্নি গোত্র ও দ্রুজ মিলিশিয়াদের সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে সরকার ব্যর্থ হয় এবং কয়েক শত দ্রুজ বেসামরিক মানুষ নিহত হন।
এদিকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও অস্বস্তি কাটেনি। কুর্দি-নিয়ন্ত্রিত সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে মাঝেমধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছে, যদিও ১০ মার্চ এসডিএফকে জাতীয় সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার একটি চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তি কার্যকর না হওয়ায় নতুন করে উত্তেজনা বাড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে অনেকের আশঙ্কা—সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে যেতে পারে, যা শুধু শক্তিশালী সিরীয় রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নই ভাঙবে না, বরং দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলবে। যদিও এই পরিণতি অনিবার্য নয়।
আলাওয়ি সংকট: ক্ষমতা নয়, বেঁচে থাকার লড়াই
ফাঁস হওয়া নথি স্পষ্ট করে যে, আসাদ সরকারের কিছু অবশিষ্ট অংশ এখনও হাল ছাড়েনি এবং কোনো না কোনোভাবে ফেরার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই প্রচেষ্টা আলাওয়ি সম্প্রদায়ের বড় অংশের মনোভাবকে প্রতিফলিত করে না।
আসাদ পরিবার যে তাদের ছেড়ে গেছে—এই অনুভূতিতে আলাওয়িরা আজ গভীরভাবে ক্ষুব্ধ ও হতাশ। বেশির ভাগ আলাওয়ি এখন নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে বেঁচে থাকার পথ খুঁজছে। উপকূলীয় অঞ্চল আলাদা করে ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন মূলত কয়েকজন চরমপন্থী ব্যক্তির কল্পনায় সীমাবদ্ধ, যার সঙ্গে সাধারণ আলাওয়িদের কোনো রাজনৈতিক সংযোগ নেই।
আজ আলাওয়িদের ভাবনায় প্রাধান্য পাচ্ছে অর্থনৈতিক দুর্দশা ও নিরাপত্তাহীনতা, বিচ্ছিন্নতাবাদ বা পুরোনো শাসন ফিরিয়ে আনার আকাঙ্ক্ষা নয়। গত মাসে তথাকথিত ‘ইসলামিক আলাওয়ি কাউন্সিল’-এর প্রধান গাজাল গাজালের ডাকা বিক্ষোভে সাড়া না পাওয়া সেটাই প্রমাণ করে। মানুষ ক্ষুব্ধ, কিন্তু দিকনির্দেশনাহীন।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান—বিশেষ করে সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী—ভেঙে দেওয়ায় কয়েক লাখ পরিবার দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীরা এক বছরের বেশি সময় ধরে পেনশন পাননি। এই পরিস্থিতিতে যদি আলাওয়ি এলাকায় সহিংসতা ফের মাথাচাড়া দেয়, তা আদর্শিক কারণে নয়, বরং চরম দারিদ্র্য ও হতাশা থেকে জন্ম নেওয়া ক্ষোভের ফল হবে—যা একপর্যায়ে ‘ক্ষুধার বিদ্রোহে’ রূপ নিতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন বিচার ব্যবস্থার অনুপস্থিতি। সাবেক সরকারের ভুক্তভোগীরা আইনের বাইরে প্রতিশোধ নিতে উৎসাহ পাচ্ছে, আবার আলাওয়িদের ওপর সামষ্টিক দোষ চাপানো হচ্ছে। এর ফল হিসেবে আলাওয়ি অধ্যুষিত এলাকায় একের পর এক প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ড ঘটছে। অনেক আলাওয়ি এখন সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছেন—গুরুতর অপরাধে দায়ী সাবেক কর্মকর্তাদের একটি স্পষ্ট তালিকা প্রকাশ করা হোক, যাতে ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ হয় এবং পুরো সম্প্রদায়ের ওপর চাপানো ‘সমষ্টিগত অপরাধী’ তকমা উঠে যায়।
দ্রুজ ও কুর্দি প্রতিরোধ: রাষ্ট্রের জন্য আরও জটিল সমীকরণ
দক্ষিণ-পশ্চিমের সুয়াইদা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। স্থানীয় দ্রুজ জনগোষ্ঠী সরকারকে তাদের এলাকায় প্রবেশ করতে স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছে। দ্রুজ ধর্মীয় নেতা হিকমত আল-হিজরি শুরু থেকেই নতুন সরকারের প্রতি সন্দিহান ছিলেন, আর মার্চের উপকূলীয় হত্যাকাণ্ডের পর তার অবস্থান আরও কঠোর হয়। গ্রীষ্মকালে তিনি কার্যত পুরো দ্রুজ সম্প্রদায়ের একমাত্র রাজনৈতিক কর্তৃত্বে পরিণত হন।
জুলাইয়ে সরকার সুন্নি গোত্রীয় যোদ্ধাদের সহায়তায় সুয়াইদায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হওয়ার পর অঞ্চলটি কার্যত স্বায়ত্তশাসিত এলাকায় পরিণত হয়। আল-হিজরি প্রকাশ্যেই ইসরায়েলের সহায়তা চান, আর ইসরায়েলের হস্তক্ষেপে দামেস্ক পিছু হটতে বাধ্য হয়।
এরপর থেকে আল-হিজরির তত্ত্বাবধানে একটি তথাকথিত ‘ন্যাশনাল গার্ড’ গড়ে উঠেছে, যার নেতৃত্বে আছেন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা এবং যাদের অস্ত্র ও অর্থায়ন দিচ্ছে ইসরায়েল। তিনি প্রকাশ্যেই স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলছেন।
উত্তর-পূর্বে এসডিএফও বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। তারা ১০ মার্চের চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়নে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে এবং গত এক দশকে অর্জিত রাজনৈতিক ও সামরিক সুবিধা ছাড়তে চাচ্ছে না। রবিবার দামেস্কে হওয়া সর্বশেষ আলোচনা ভেঙে পড়ার পর আলেপ্পোর কুর্দি অধ্যুষিত এলাকায় তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়, যা দেশকে জাতিগত বিভাজনের ভিত্তিতে আরেকটি গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট এসডিএফের প্রায় ৬০ হাজার যোদ্ধা রয়েছে। তারা দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড ও উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। বাস্তবে তারা ইরাকের কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের মতো একটি মর্যাদা পেতে চায়।
ঐক্য রক্ষা: অসম্ভব নয়, তবে কঠিন
অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন, সিরিয়া আবার পূর্ণমাত্রার গৃহযুদ্ধে জড়াবে। আপাতত তা হয়নি। তবে চ্যালেঞ্জ যে ভয়াবহ, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় সমর্থন না থাকা, ইসরায়েলি হস্তক্ষেপের আশঙ্কা এবং উপকূল ও সুয়াইদায় সমন্বিত অস্থিরতার ভয়ে দামেস্কের হাতে দ্রুত দেশ একত্রীকরণের মতো শক্তিশালী চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা নেই। আবার সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর পক্ষেও সরকারকে পুরোপুরি চ্যালেঞ্জ করার সামর্থ্য নেই। এই দ্বন্দ্ব সিরিয়াকে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত কার্যত বিভক্তিতে পরিণত হতে পারে।
ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘটনা এই আশঙ্কা আরও বাড়িয়েছে—অনেকে মনে করছেন, সিরিয়াকেও দুর্বল করতে একই ধরনের বিভাজন কৌশল প্রয়োগ করা হতে পারে।
তবে সব শক্তি এই বিভক্তি চায় না। আইএসআইএলের পুনরুত্থান ও ইরানের প্রভাব ফিরে আসার আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও এসডিএফকে ১০ মার্চের চুক্তি বাস্তবায়নে চাপ দিচ্ছে। তুরস্কও এসডিএফকে নমনীয় হতে বাধ্য করতে সক্রিয় এবং কুর্দি বিচ্ছিন্নতাব মনে হলে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছে। ইউরোপের বহু দেশ—বিশেষ করে জার্মানি ও যুক্তরাজ্য—শরণার্থী প্রত্যাবাসনের স্বার্থে সিরিয়ার স্থিতিশীলতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের যৌথ বিমান হামলাও সেই আগ্রহেরই প্রতিফলন।
তবু প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সরকার শুধু বাইরের সহায়তার ওপর ভর করে সিরিয়ার ঐক্য ধরে রাখতে পারবে না। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, জাতীয় ঐক্য সরকার, নতুন সংবিধান প্রণয়নে সর্বস্তরের অংশগ্রহণ এবং একটি জাতীয় সংলাপ সম্মেলন—এসব উদ্যোগই ক্ষতবিক্ষত অঞ্চলগুলোর আস্থা ফেরাতে পারে।
এর পাশাপাশি সীমান্ত পেরোনো বিচার প্রক্রিয়া ও জাতীয় পুনর্মিলন উদ্যোগ গত ১৪ বছরের ক্ষত সারাতে সহায়ক হতে পারে। উপকূল, সুয়াইদা ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংখ্যালঘুদের প্রতি বাস্তবমুখী সমঝোতার ইঙ্গিতও জরুরি। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই সব রাজনৈতিক পদক্ষেপের সঙ্গে যদি দারিদ্র্য ও ভয়াবহ বেকারত্ব মোকাবিলার জন্য কার্যকর অর্থনৈতিক নীতি না থাকে, তাহলে কোনো উদ্যোগই টেকসই হবে না।
এই সবকিছু একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলেই সিরিয়া বিভাজনের চক্রান্ত মোকাবিলা করে আবার একটি রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়াতে পারে।

