ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযান ও প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার চেষ্টা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও আগ্রাসী সুর শোনা যাচ্ছে। সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারা, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সমর্থকরা এমনকি ট্রাম্প নিজেও গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি—জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গ্রিনল্যান্ডের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য।
ডেনমার্কে এই হুমকি প্রবল আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। কারণ গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল এবং ন্যাটোর অংশ।
ট্রাম্পের মতে, গ্রিনল্যান্ড আর্কটিক অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় এটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া ও চীন আর্কটিক অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখানে থাকলে আগাম সতর্কতা ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। ট্রাম্প প্রশাসনের ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রকল্পের ক্ষেত্রেও গ্রিনল্যান্ডকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে, গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব নতুন নয়। পিটুফিক স্পেস বেস ১৯৪৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহারে রয়েছে। এটি বর্তমানে স্পেস ফোর্সের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি এবং এখানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। ১৯৫১ সালের প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে আরও সেনা মোতায়েন করতে পারে। শীতল যুদ্ধের সময় এখানে প্রায় ৬,০০০ মার্কিন সেনা অবস্থান করত।
যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী হুমকি সত্ত্বেও বাস্তবে গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রমাণ নেই। তারা চাইলে সহজেই সেনা সংখ্যা বাড়াতে পারে, কিন্তু বৈধভাবে পুরো অঞ্চল দখল করা প্রয়োজন নয়।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেছেন, “গ্রিনল্যান্ডের বিরুদ্ধে কোনো হুমকি গ্রহণযোগ্য নয়। ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ড দখল করলে জোটের অস্তিত্বই ধ্বংস হবে।” ন্যাটোর মূলনীতি হলো—একজন সদস্যের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা। যুক্তরাষ্ট্র যদি এ নীতি ভাঙে, তাহলে ন্যাটোর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
ন্যাটো নিজেকে আইনের রক্ষক ও গণতন্ত্রের রক্ষক হিসেবে দাবি করে। তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি ভেনেজুয়েলায় বেআইনি হামলা চালায় বা গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দেয়, তাহলে ন্যাটোর নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে যাবে। ইউরোপীয় দেশগুলোকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেবে কি না।
অনেকে মনে করেন, ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অসহায়। কিন্তু বাস্তবে নয়। ইউরোপ চাইলে মার্কিন ঘাঁটিতে উচ্চ ভাড়া দাবি করতে পারে, জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করতে পারে, চিকিৎসা সুবিধা দিতে অস্বীকার করতে পারে, এমনকি কিছু ঘাঁটি বন্ধও করতে পারে। এই পদক্ষেপই যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাবে যে ইউরোপ কোনো ‘ফ্রি রাইডার’ নয়।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি শুধু ডেনমার্ক নয়, পুরো ন্যাটো জোটের জন্যও সংকট তৈরি করেছে। ইউরোপীয় দেশগুলো এখন একটি ঐতিহাসিক মোড়ের মুখে—নীরব থাকবে, নাকি আন্তর্জাতিক আইন ও নিজের নিরাপত্তার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেবে। এ সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের ইউরোপ নিরাপদ হবে কি আরও অনিশ্চিত।

