ইতিহাসের পাতা উল্টালেই চোখে পড়ে ১৯৫৩ সালের সেই আগস্ট। তখনই শুরু হয় ইরানের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বের এক গভীর অধ্যায়। ওই বছর ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সহায়তায় ইরানের সেনাবাহিনী ক্ষমতাচ্যুত করে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে। এর প্রায় দুই বছর আগে তিনি দেশটির আইনসভা মজলিসের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন।
আজ যে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে গণতন্ত্র রক্ষার কথা বলে, ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। প্রায় ৭৩ বছর আগে এই দুই পশ্চিমা শক্তিই ইরানের গণতান্ত্রিক যাত্রাকে থামিয়ে দিয়েছিল। মোসাদ্দেককে সরিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে সেই পথ কার্যত রুদ্ধ হয়ে পড়ে।
ইতিহাস আরও জানায়, মোসাদ্দেক ব্রিটিশ মালিকানাধীন অ্যাংলো-পারসিয়ান ওয়েল কোম্পানিকে জাতীয়করণ করলে তা সরাসরি ব্রিটিশ ও মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। এই সিদ্ধান্তই তাকে ক্ষমতা হারানোর দিকে ঠেলে দেয়। সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে সরিয়ে দিয়ে পশ্চিমপন্থি শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ইরানের সর্বময় ক্ষমতায় বসানো হয়।
সংক্ষেপে ‘রেজা শাহ’ নামে পরিচিত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ক্ষমতায় টিকে থাকতে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ক্রমেই গভীরভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। পশ্চিমা ধাঁচে নেওয়া তার আর্থসামাজিক সংস্কার ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজ দেশেই অজনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

শাহ সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও বিরোধী মত দমনের অভিযোগ জোরালো হতে থাকে। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ও সাধারণ মানুষের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগও বাড়তে থাকে। এসব কারণে রেজা শাহের বিরুদ্ধে জনরোষ ক্রমে তীব্র হয়। এই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৭৯ সালে। এক অভাবিত গণ-অভ্যুত্থানে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে চিরতরে দেশ ছাড়তে হয়। এর মধ্য দিয়ে শেষ হয় তার শাসনকাল, কিন্তু ১৯৫৩ সালের সেই ঘটনার রেশ ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্কে আজও স্পষ্ট।
অ্যাংলো-পারসিয়ান ওয়েল কোম্পানিকে জাতীয়করণ করার পরই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ইরানের তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তেলকে জাতীয় সম্পদ ঘোষণা করায় ইরান একসঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। ব্রিটিশরা ইরানের তেলের বাজার থেকে নিজেদের পুরোপুরি সরিয়ে নেয়।

এই অবস্থায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক দ্রুত বিকল্প তেলের বাজার খুঁজে বের করতে ব্যর্থ হন। ফলে ইরানের সামগ্রিক অর্থনীতি মারাত্মক ধাক্কা খায়। অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে না পারায় দেশে ও বিদেশে তার বিরুদ্ধে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। অনেক মিত্র ও সমর্থকও ধীরে ধীরে তার ওপর নাখোশ হয়ে পড়ে। এক সময় যিনি ছিলেন জনসমর্থনের শীর্ষে, সেই মোসাদ্দেকই পরে পড়েন চরম চাপে। জনতার কাঁধে তোলা সেই জনপ্রিয় নেতার রাজনৈতিক অবস্থান দ্রুত দুর্বল হয়ে যায়।
নিউইয়র্কভিত্তিক মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক নিয়ে এক প্রতিবেদনে জানায়, এক সময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র এই দুই দেশের মধ্যে ইসলামী বিপ্লবের পর টানা চার দশক ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ক্ষমতায় আসার পরের বছর অর্থাৎ ১৯৫৪ সালে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ইরানের তেল নিয়ে একটি চুক্তিতে সম্মত হন। এই চুক্তির ফলে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের তেল কোম্পানিগুলো ২৫ বছরের জন্য, অর্থাৎ ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত, ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত তেলশিল্পের ৪০ শতাংশ মালিকানা পায়।
বৈশ্বিক শক্তির খেলায় ইরান কি শুধুই দাবার ঘুঁটি?
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ক্ষমতায় এসে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ধীরে ধীরে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ান। সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৭ সালে ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি বেসামরিক পরমাণু চুক্তি করে তেহরান।
চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ইরানকে পরমাণু রিঅ্যাক্টর এবং বোমা তৈরির উপযোগী সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরবরাহ করে। পরমাণুশক্তি নিয়ে দুই দেশের এই সহযোগিতা শাহবিরোধী বিপ্লবের আগ পর্যন্ত, অর্থাৎ ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। পরমাণু চুক্তির পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার হয়। ১৯৭২ সালের মে মাসে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ইরান সফর করেন। সফরে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষায় শাহের সহায়তা চান।
তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল ইরানের উত্তরের প্রতিবেশী। দক্ষিণ-পশ্চিমে ছিল সোভিয়েত-সমর্থিত ইরাক। যুক্তরাষ্ট্র এই পরিস্থিতিকে নিজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। সে কারণে নিক্সন ইরানকে শক্তিশালী করার ঘোষণা দেন।
প্রতিবেদন বলছে, ওই সফরেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট মিত্র ইরানকে পরমাণু অস্ত্র ছাড়া সব ধরনের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের আশ্বাস দেন। এর পর ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। একই সময় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরব দেশগুলোর তেল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এই সুযোগে রেজা শাহ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্র কিনতে শুরু করেন।
রেজা শাহের শাসনামলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৫৩ সালে পশ্চিমা সহায়তায় ক্ষমতায় এসে তিনি নিজ দেশের ছাত্র ও সাধারণ মানুষকে ‘কমিউনিস্ট’ আখ্যা দিয়ে দমন-পীড়ন শুরু করেন।
নিউইয়র্কভিত্তিক এনসাইক্লোপিডিয়া ইরানিকার তথ্য অনুযায়ী, রেজা শাহ ইরানকে আধুনিক ও পশ্চিমাধাঁচের রাষ্ট্রে রূপ দিতে চাইলেও তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশের তরুণরা পাহলভি রাজবংশ উৎখাত করতে চায়। তিনি জনগণের আর্থিক দুরবস্থা দূর করার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার শাসনামলে শ্রমিকশ্রেণির জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে ওঠে। এর ফলে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে শাহবিরোধী মনোভাব বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক আদর্শও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সামরিক সহযোগিতা নিয়ে অনেক বিশ্লেষকের ভাষ্য, ‘কমিউনিস্ট’ তকমা পাওয়া সাধারণ মানুষই তখন সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়। ক্ষমতায় এসে রেজা শাহ তার রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনে ‘সাভাক’ নামে একটি গোয়েন্দা সংস্থা গড়ে তোলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, তেল বিক্রির বিপুল অর্থে রেজা শাহ ও তার ঘনিষ্ঠ মহল সমৃদ্ধ হলেও সাধারণ মানুষ তেমন কোনো সুবিধা পায়নি। বরং যুক্তরাষ্ট্রের পরামর্শে সোভিয়েত প্রভাব ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তা ঠেকাতে তরুণদের ওপর দমন-পীড়ন আরও জোরদার করা হয়।
এই পরিস্থিতিতে সাভাক বাহিনীর নির্যাতন সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে শাহের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ করে তোলে। বাহিনীটি এতটাই কুখ্যাত হয়ে ওঠে যে অনেকের মতে, তাদের কর্মকাণ্ডই রেজা শাহের পতনকে ত্বরান্বিত করে।
সমালোচকদের ভাষ্য, ইরানকে আধুনিক রাষ্ট্রে রূপ দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে রেজা শাহ সাধারণ মানুষের কল্যাণে তেমন কিছু করতে পারেননি। দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও দমন-পীড়ন ছিল তার শাসনামলের প্রধান বৈশিষ্ট্য। ইরানের প্রাকৃতিক সম্পদ পশ্চিমা দেশগুলোয় পাচারের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
শাহবিরোধী বিশ্লেষকদের মতে, রেজা শাহের শাসনামলে ইরান মূলত পশ্চিমা দেশগুলোর, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষায় ‘দাবার ঘুঁটি’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সোভিয়েতপন্থি কয়েকটি আরব দেশের বিরুদ্ধে তাকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগানো হয়েছিল বলেও তাদের মন্তব্য।
একের পর এক সংকটে জর্জরিত ইরান:
রেজা শাহের অনাচার ও দুঃশাসন থেকে মুক্তি পেতে ইরানের জনগণ ১৯৭৯ সালে যে অভ্যুত্থান ঘটায়, রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা পরবর্তীতে সেটিকে ‘ইসলামী বিপ্লব’ হিসেবে অভিহিত করেন। তাদের মতে, স্বৈরশাসক রেজা শাহ পাহলভির বিরুদ্ধে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের ক্ষোভ জমে উঠেছিল। সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণেই ১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন পারস্যরাজ।
শাহের পালানোর ১৫ দিন পর, অর্থাৎ ১ ফেব্রুয়ারি দেশে ফেরেন নির্বাসিত ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। শাহবিরোধী অবস্থানের কারণে তাকে ইরাক, তুরস্ক ও ফ্রান্সে টানা ১৪ বছর নির্বাসনে থাকতে হয়েছিল। দেশে ফিরে খোমেনিকে তার অনুসারীরা ‘রাহবার’ বা পথপ্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং ইরানের প্রাকৃতিক সম্পদ দেশের নাগরিকদের কল্যাণে ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দেন। একই সঙ্গে ইরানকে ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেন।

ক্ষমতায় আসার পর খোমেনি দেশের খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের একচ্ছত্র মালিকানা প্রতিষ্ঠা করেন। রাষ্ট্রনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ইরানের প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ওই বছরের নভেম্বরে উগ্রপন্থী শিক্ষার্থীদের একটি দল তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে হামলা চালিয়ে ৫২ জন মার্কিন নাগরিককে জিম্মি করলে ইরান দ্রুত বিশ্বমঞ্চে, বিশেষ করে মার্কিন বলয়ে একঘরে হয়ে পড়ে। এর পরপরই দেশটির ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
এই ঘটনার ১০ মাস পর, ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতিবেশী ইরাক ইরানের ওপর সামরিক আগ্রাসন চালায়। সোভিয়েতঘেঁষা হিসেবে পরিচিত ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের পাশে দাঁড়ায় আঞ্চলিক শক্তি সৌদি আরবসহ পশ্চিমা মিত্ররা। পশ্চিমা অস্ত্রে সজ্জিত ইরাকের এই অপ্রত্যাশিত হামলা ইরানের অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ইরানের সরকারি সূত্রগুলো জানায়, ইসলামী বিপ্লবের ১০ মাস পর, অর্থাৎ ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিবেশী আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে। সেই আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানিয়ে তেহরান যখন মস্কোর বিরাগভাজন হয়, ঠিক তখনই ইরাক আগ্রাসন চালায়। এর ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বেশি দামে অস্ত্র কিনতে বাধ্য হয় ইরান। একই সময়ে সোভিয়েত আগ্রাসনের কারণে আফগানিস্তান থেকে লাখো শরণার্থী ইরানে আশ্রয় নেয়। ফলে দেশটির পশ্চিম সীমান্তে যুদ্ধ চলছিল, আর পূর্ব সীমান্তে ছিল শরণার্থীর চাপ। এই দ্বিমুখী সংকট ইরানের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

এরপর ইরাকের সঙ্গে দীর্ঘ আট বছরের যুদ্ধ শেষে ইরান যখন ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করে। ১৯৯২ সালে জর্জ বুশ সিনিয়র ইরানের তেল বাণিজ্যের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেন। এর এক দশক পর, ২০০২ সালে জর্জ বুশ জুনিয়র ক্ষমতায় এসে ইরানকে ‘শয়তানের অক্ষ’ হিসেবে আখ্যা দেন। তার শাসনামলে নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে ইরানের অর্থনীতি আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে পরমাণু গবেষণা ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার অভিযোগে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা ইরানকে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। অন্যদিকে, গোপনে তেল বিক্রির অর্থে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে নিজের ‘প্রতিরোধ বলয়’ গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দেয়। হিজবুল্লাহ, হুতি ও হামাসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থনের অভিযোগও ওঠে তেহরানের বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি আল জাজিরার একটি মতামত প্রতিবেদনে ‘ইরান, দ্য ইউএস অ্যান্ড দ্য ইংলিশ জব’ শিরোনামে ব্রিটিশ ও মার্কিন কৌশলে ইরানের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ার চিত্র তুলে ধরা হয়। সেখানে দেখানো হয়, ধারাবাহিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞায় দেশটির অর্থনৈতিক কাঠামো কীভাবে নড়বড়ে হয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সরকার জনগণের জীবনমান উন্নয়নের বদলে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। এই ব্যয়ের প্রতিবাদে মানুষ রাজপথে নামলে তা কঠোর হাতে দমন করা হয়। তাদের মতে, বর্তমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের মূল কারণ অর্থনৈতিক দুর্দশা।
সরকারবিরোধীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ মনে করে তারা চরম আর্থিক সংকটে রয়েছে। আর ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ বর্তমান খামেনি সরকারের অবসান চায়। বাস্তবতা হলো, ইরানবাসী নতুন শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে ধসে পড়া অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন দেখতে চায়। ঠিক এই দাবিতেই ৪৭ বছর আগে তারা রাজপথে নেমেছিল তৎকালীন শাসক রেজা শাহকে উৎখাত করতে।

